রোজ সন্ধ্যায় এক জোড়া হাস আমার চারিদিকে ঘোরাফেরা করতো, তারা একদম ভয় পেতো না, সে সময় আমি আমাদের বাড়ীর পিছনে লেকের ধারে ফোয়ারার সামনে চেয়ার টেবিলে বসে কিছু লেখার চেষ্টা করতাম, আবার কখনো কখনো বই পড়তাম। সে সময় অনেক পাখী নিজ নিজ বাসায় ফেরার জন্য আকাশে উড়ে বেড়াতো, আবার কোন কোন পাখীরা লেকের পানিতে প্লেন ল্যান্ডিং করার মত ডানা ঝাপটে পানিতে নামতো, মনে হতো সারাদিনের ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরার আগে পানিতে গা ডুবিয়ে ফ্রেশ হয়ে ঝাঁক বেধে ঘরে ফেরার জন্য আবার উড়াল দিতো, তখন নিভান্ত সময়ে আলো- আঁধারে পাখী গুলিকে দেখে মনিহার সিনেমার লতা মুঙেসকারের( হয়তোবা) গাওয়া সেই গানটি মনে পড়ে যেতো –
নিঝুম ও সন্ধ্যায় পান্থ পাখীরা
বুঝিবা পথ ভুলে যায়
কুলায়ে যেতে যেতে কি যেনো
কাকলীর আমাকে দিয়ে যেতে চায়।
আমি লক্ষ্য করেছি লেকের পানিতে উডান্ত হাঁসগুলিকে মনের সুখে সাঁতরাতে। সেখান থেকে দু’টি হাঁসকে দেখতাম তারা দলছুট হয়ে আমার কাছে এসে হাজিরা দিতো।
তবে এটা খেয়াল করেছি, হাঁস দু’টি যখন আমার সামনে হাজির হতো তখন লেকের সচ্ছ পানিতে ভেসে বেড়িয়ে অন্য হাঁস গুলি চলে যাবার পরে আসতো। হাঁসগুলিকে আমি প্রায়ই পাওরুটি ছিড়ে ছিড়ে দিতাম। তারা তখন বেশ মজা করে খেয়ে নিতো। তাদের খাওয়া দেখে আমার খুব ভাল লাগতো। আমার একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল, তাদের খাওয়া না দিলে আমার নিজের কাছেই ভীষন খারাপ লাগতো।
একদিন আমি পিছনের লেকের ধারে যাইনি, কারণ আমার কাঁছে কিছু বন্ধুরা এসেছে, তারা লিভিংরুমে বসে টিভি দেখছেন আর আমার জন্য অপেক্ষা করছেন, তাদের সামনের টেবিলে নাস্তা। বুঝলাম সেখান থেকে তাদের আর লেকের ধারে নেওয়া যাবে না। খাওয়ার পর্ব শেষে চা পান করে তাদের বিদায় দিয়ে লেকের ধারে যাবো বলে মনস্থির করেছি। এমন সময় আমাকে না দেখে প্যাক প্যাক আওয়াজ কানে এলো। আমি অতিথিদের বিদায় জানিয়ে লেকের ধারে এলাম ঠিকই তবে সেই হাঁসগুলি ততক্ষনে চলে গেছে। বুঝতে আর বাকি রইলো না সেগুলি আমার জন্য অপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত চলেই গেছে। তখন আমার নিজের প্রতি নিজেরই খুব রাগ ও দু:খ হলো।
পরদিন লিখছি আর হাঁস গুলির অপেক্ষায় আছি, এদিকে সূর্য অস্তচলে যাবার জন্য তডি ঘড়ি করছে, তার রক্তিম আভা চারিদিকে মেলে ধরেছে।
কিন্তু তাদের আর আসার নাম গন্ধ না পেয়ে ভীষন কষ্ট লাগতে লাগলো, বুঝতে অসুবিধা হলো না তারা হয়তো অভিমান করেছে।
ছোট বেলার পড়া একটি কবিতার লাইন মনে পড়লো—
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, বেলা গেলো ঐ
কোথা গেলো হাঁস গুলি,
তই তই তই।
আঁধার নামিছে ধীরে বালুচরে নদী তীরে
বেলা গেল, কোন দূরে কত চেয়ে রই।
আয় ঘরে, আয় তোরা
তই তই তই।”
তারা আর এলোই না। ভাবলাম হয়তো হাঁস দুটি আমাকে ভুলেই গেছে অথবা অন্য কোন জায়গায় খাবারের সন্ধান পেয়েছে। বেশ কিছুদিন পর আমি আমার রুটিন মাফিক একটি বই পড়ছিলাম এমন সময় সেই হাঁস গুলি এসেই আমার সামনে ঘুরঘুর করতে লাগলো খেয়াল করলাম তাদের সাথে আরও একটি ছোট্ট হাঁসের ছানা যোগ হয়েছে। সেই ছোট বাচ্চাটির তখনও ঠিকমত গায়ে লোম হয়নি, বুঝলাম তাদেরই সদ্য নবজাতক। তাই তারা খাবারের চাইতে তাদের বাচ্চাকে একটু বড় করার চেস্টা করেছে। আগে ছিল দু’টি এবার হলো তিনটি। সে জন্য আমি তাদের খাবার একটু বেশীই দিলাম লক্ষ্য করলাম তারা নিজেরা খাওয়ার চাইতে তাদের বাচ্চাকে খাওয়ার জন্য সুযোগ করে দিচ্ছে।
এতদিন পরে হাঁসদের আসতে দেখে আমার মনটা ভরে গেলো খুশীতে, এরপর থেকে আমি ওদের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনতাম, তারাও সময় মতো এসে কিছুক্ষন আমার পায়ের সামনে ঘুর ঘুর করে ঘুরে বেরাতো এবং প্যাক প্যাক করে ডাক দিতো, আমি তখন বুঝে যেতাম এবার তাদের খাবার চাই।
তারা রুটি পেয়ে সাথে সাথে এক নিমিষে সাবাড় করে ফেলতো। আমি সপ্তাহ তিনেকের জন্য জরুরী কাজে দেশে গেলাম। সবাই জানলেও হাঁসগুলি তো তা জানতো না।
যথা নিয়মে আমার অবর্তমানে হাঁস গুলি এসে খাবারের খোজে ডাকতে লাগলো, কিন্তু একদিন বিরক্ত হয়ে আমাদের চাচাতো ভাই সে হাঁস গুলিকে ধরতে চেস্টা করে ব্যার্থ হয়ে ঢিল মেরে আহত করলো ।
এরপর সে হাঁস গুলি আর এ মুখো হয়নি। দেশ থেকে ফিরে আমি খুশী মনে অভ্যাস মতো লেকের ধারে বসে চিন্তা করছিলাম হাঁস গুলি এসেই প্যাক প্যাক শব্দে আনন্দে আত্মহারা হয়ে সামনে এসে হাজির হবে, কিন্তু হায় সে গুড়ে বালি, তখন চিন্তা করলাম কই হাঁস গুলিতো এখনো এলো না? ভাবলাম এবার তারা হয়তো তাদের নতুন বন্ধুকে পেয়ে আর হয়তো ফিরে আসবে না। তাদের না দেখে আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। যখন জানলাম হাস না ফেরার কারণ আমারই চাচাতো ভাইয়ের কীর্তি তারপরও ভেবেছিলাম ঐ ঘটনা ভুলে গিয়ে আবার তারা এসে আমার সামনে ঘোড়াফেরা করবে। কিন্ত না তারা আর ফিরে আসেনি। আমি প্রতিদিন পিছনের লেকের ধারে ফোয়ারার সামনে বসে হাঁসগুলির অপেক্ষায় থাকতাম।


























































