ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলের ছোট একটি শহরে অবৈধ অভিবাসীদের আগমনকে কেন্দ্র করে আয়োজিত বিক্ষোভের সময় পুলিশ কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইংলিশ চ্যানেলের মাঝপথে আরএনএলআই (RNLI) এবং একটি ফরাসি জাহাজের যৌথ উদ্ধার অভিযানে ১৪৯ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল রবিবার হ্যাম্পশায়ারের গসপোর্ট এলাকার একটি মেরিনায় অভিবাসন-বিরোধী প্রায় ১৫০ জন বিক্ষোভকারীর সাথে পুলিশের মুখোমুখি অবস্থানের সময় কিছু ফ্লেয়ার (সংকেত বাতি) জ্বালানো হয় এবং পুলিশের সাথে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।
পুলিশ কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং বর্ণবাদী আচরণসহ বিভিন্ন অপরাধের সন্দেহে ১১ জন পুরুষ ও একজন নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা সবাই বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন। আগত অবৈধ অভিবাসীদের বাসযোগে কেন্টের একটি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ উপকূলের পশ্চিমে বিপুল সংখ্যক অবৈধ অভিবাসীর আগমন এটি দ্বিতীয় ঘটনা। গসপোর্টের হাসলার রোডে পুলিশি বেষ্টনী বা কর্ডন বসানো হয়েছিল; সেখানে বিক্ষোভ চলাকালে পরিস্থিতি মূলত শান্তিপূর্ণই ছিল। কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে সেগুলোর পথ আটকে দেয় এবং “তোমাদের লজ্জা হওয়া উচিত” ও “সবাইকে ফেরত পাঠাও” (ডিপোর্ট দ্য লট) বলে স্লোগান দিতে থাকে।
হ্যাম্পশায়ার পুলিশ জানিয়েছে, সমুদ্রে কোনো জরুরি পরিস্থিতি দেখা দিলে সহযোগী সংস্থাগুলোকে—যেমন মেরিটাইম অ্যান্ড কোস্টগার্ড এজেন্সি, আরএনএলআই এবং বর্ডার সিকিউরিটি কমান্ড—সহায়তা করার জন্য তারা সেখানে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছিল। পুলিশ বাহিনী ‘পাবলিক অর্ডার অ্যাক্ট’ বা জনশৃঙ্খলা আইনের আওতায় বিভিন্ন শর্ত আরোপ করে এবং মুখ ঢেকে রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে সামান্য আহত কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, তবে সেখানে উপস্থিত কারও গুরুতর আঘাত লাগেনি।
সহকারী চিফ কনস্টেবল সাইমন ডডস বলেন: “শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে সহিংসতা ও সম্পত্তির ক্ষতিসাধনের কোনো স্থান নেই। “এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট: আমরা বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করব এবং যারা এর জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব।
“গত রাতে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যা কোনোভাবেই শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ছিল না, বরং ছিল সহিংস বিশৃঙ্খলা। হ্যাম্পশায়ার ও আইল অফ ওয়াইট-এর বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে কাজ করার সময় এ ধরনের আচরণ আমরা কোনোভাবেই বরদাস্ত করব না।” তিনি আরও বলেন, ওই এলাকায় “সবার নিরাপত্তা” নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যরা “অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কাজ করছিলেন”, তাই তাদের ওপর হামলার ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। তিনি বলেন “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের বা আমাদের সহযোগী সংস্থার কাউকে আলাদাভাবে লক্ষ্যবস্তু করা কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের হেনস্তার শিকার হতে দেওয়া—কোনোটাই কাম্য নয়,”। “অনলাইনে আসা যেকোনো হুমকির মোকাবিলায় আমরা পুলিশ বিভাগের অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে নিয়ে কাজ করব। “অন্য কোনো অপরাধ শনাক্ত করতে আমরা ‘বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা’র (শরীরে লাগানো ক্যামেরা) ফুটেজ ও অনলাইনে পোস্ট করা ভিডিওগুলো পর্যালোচনা করা অব্যাহত রাখব এবং প্রয়োজনে যথাসময়ে আরও গ্রেপ্তার করা হতে পারে।” যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা হলেন:
বগনার রেজিস-এর ৩৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে পুলিশ কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করা, নিষিদ্ধ সমাবেশের নির্দেশ অমান্য করা এবং এলাকা ত্যাগের নির্দেশনার (dispersal order) শর্তাবলী না মানার সন্দেহে আটক করা হয়েছে। ফেয়ারহ্যাম-এর ৩৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে নিষিদ্ধ সমাবেশের নির্দেশ অমান্য করার সন্দেহে আটক করা হয়েছে। গোসপোর্ট-এর ৪৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে পুলিশ কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করা, সম্পত্তির ক্ষতিসাধন এবং জনসমক্ষে মদ্যপ ও বিশৃঙ্খল আচরণের সন্দেহে আটক করা হয়েছে।
পোর্টসমাউথ-এর ২৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে পুলিশ কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করা এবং নিষিদ্ধ সমাবেশের নির্দেশ অমান্য করার সন্দেহে আটক করা হয়েছে। গোসপোর্ট-এর ৫৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে পুলিশ কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার সন্দেহে আটক করা হয়েছে। গোসপোর্ট-এর ২২ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে মারামারি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং বর্ণবাদী বিদ্বেষমূলক আচরণের মাধ্যমে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের সন্দেহে আটক করা হয়েছে। ফেয়ারহ্যাম-এর ৪২ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে জনসমক্ষে মদ্যপ ও বিশৃঙ্খল আচরণ এবং এলাকা ত্যাগের নির্দেশনার শর্তাবলী না মানার সন্দেহে আটক করা হয়েছে।
৩৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে জরুরি সেবাকর্মীকে মারধর করা এবং নিষিদ্ধ সমাবেশের নির্দেশ অমান্য করার সন্দেহে আটক করা হয়েছে।
এমসওয়ার্থ-এর ৩৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে সম্পত্তির ক্ষতিসাধন, ক্ষতিসাধনের চেষ্টা এবং বিক্ষোভের সময় আতশবাজি বা পাইরোটেকনিক সামগ্রী কাছে রাখার সন্দেহে আটক করা হয়েছে।
এমসওয়ার্থ-এর ৫৭ বছর বয়সী এক নারীকে পুলিশ কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার সন্দেহে আটক করা হয়েছে।
গোসপোর্ট-এর ৫৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে বর্ণবাদী বিদ্বেষমূলক আচরণের মাধ্যমে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের সন্দেহে আটক করা হয়েছে
নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই এমন ২৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে মহাসড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির সন্দেহে আটক করা হয়েছে; ক্লেহল রোড দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স চলাচলে বাধা দেওয়ার ঘটনায় তাকে আটক করা হয়। এছাড়া পাঁচ ব্যক্তিকে ‘সেকশন ৩৫’ অনুযায়ী এলাকা ত্যাগের নোটিশ (dispersal notice) দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র এ যাত্রায় কেন গসপোর্টকে (Gosport) বেছে নেওয়া হয়েছে তা ব্যাখ্যা করতে অস্বীকৃতি জানান; তিনি বলেন, তারা কোনো “কার্যক্রম-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া” নিয়ে মন্তব্য করেন না। তারা বলেন, “সীমান্ত নিরাপত্তা কমান্ড (Border Security Command) ইংলিশ চ্যানেল পর্যবেক্ষণ এবং আমাদের সীমান্ত সুরক্ষায় দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছে।” তারা আরও বলেন, “ছোট নৌকায় করে আসা প্রতিটি দলকে আটকে রাখা, তাদের তথ্য যাচাই করা এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি।”
এক মাসের মধ্যে এটি তৃতীয়বারের মতো এমন পারাপারের ঘটনা। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ছোট নৌকায় করে চ্যানেল পাড়ি দেওয়া মানুষের সংখ্যা ১৯,৪৫১ জন বলে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই সংখ্যাটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৩% কম এবং ২০২৪ সালের এই পর্যায়ের সংখ্যার চেয়ে ২৩% কম। গত মাসে পোর্টসমাউথের ইস্টনিতে (Eastney) ১০০ জনেরও বেশি অভিবাসী এসে পৌঁছান, যার জেরে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। অবশেষে ওই ৫১ জন অভিবাসীকে সমুদ্রপথে ডোভারে (Dover) নিয়ে যাওয়া হয়।




































































