কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর ক্ষেত্রে নারীদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একটি সমস্যা বা নেতিবাচক মনোভাব দেখা যাচ্ছে—মর্গান স্ট্যানলির সদ্য প্রকাশিত এক জরিপে এমনটাই উঠে এসেছে। জরিপটিতে দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা এই নতুন প্রযুক্তির বিষয়ে অনেক বেশি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।
বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ: নারীরা এআই-এর প্রসারের সুফল—বিশেষ করে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে—ঠিকভাবে পাচ্ছেন না বলে মনে হচ্ছে। এছাড়া জরিপে দেখা গেছে, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিষয়গুলো নিয়ে পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি উদ্বিগ্ন।
পরিসংখ্যানের আলোকে: মর্গান স্ট্যানলি গত সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে ২,০০০ জন ভোক্তার ওপর একটি জরিপ চালায়। এতে তাদের কাছে এআই সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা (ইতিবাচক না নেতিবাচক) জানতে চাওয়া হয়। এরপর ‘নেট সেন্টিমেন্ট’ বা সামগ্রিক মনোভাবের ভারসাম্য পরিমাপ করা হয় (ইতিবাচক ও নেতিবাচক মতামতের পার্থক্য নির্ণয়ের মাধ্যমে)।
এক্ষেত্রে পুরুষদের মনোভাব ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে ইতিবাচক (+৩০%); অন্যদিকে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল -১%।
ওয়াল স্ট্রিটের এই ব্যাংকটি এপ্রিল মাসে যখন জরিপ শুরু করেছিল, তখন থেকেই নারী ও পুরুষের মধ্যে এই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য বিদ্যমান। সে সময় নারীদের মনোভাব ছিল +৬%। পুরুষদের মনোভাব অবশ্য মোটামুটি অপরিবর্তিতই রয়েছে।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ: যাদের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক, তাদের মধ্যে নারী ও পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান। উভয় পক্ষই ‘প্রতারণার কাজে এআই-এর ব্যবহার’ বা ‘ভুল তথ্য ছড়ানো’-র মতো কারণগুলোকে এর জন্য দায়ী করেছে।
তবে কিছু মূল পার্থক্যও ছিল: ৪৪% নারী বলেছেন, “আমি আমার বাড়ির কাছে কোনো ডেটা সেন্টার তৈরি হোক তা চাই না”; পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৩৬%।
কিছুটা বেশি সংখ্যক নারী (৫৭%) জানিয়েছেন তারা এআই পছন্দ করেন না কারণ “যথেষ্ট সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়াই এটি খুব দ্রুত বিকশিত হচ্ছে।” পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৫৪%।
ডেটা বা তথ্যের গোপনীয়তা নিয়েও পুরুষরা বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন (পুরুষদের ক্ষেত্রে ৪৯%, নারীদের ক্ষেত্রে ৩৯%)।
সামগ্রিক চিত্র: এআই-এর নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সাম্প্রতিক খবর এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের কারণে এর বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি: যদিও ব্যাংকটির জরিপে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রে এআই-এর প্রতি সামগ্রিক মনোভাব ইতিবাচক, তবুও নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গি মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়।
বয়স্ক ব্যক্তিরা: ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই মনোভাব -১৪%, যেখানে ৫৫ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে তা প্রায় +২৫%।
স্বল্প আয়ের ভোক্তারা। যাদের আয় বছরে ১,০০,০০০ ডলার বা তার বেশি, তাদের মধ্যে এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাবের হার +২৭%; অন্যদিকে যাদের আয় ৫০,০০০ ডলারের কম, তাদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র +৭%।
উদারপন্থীদের (লিবারেল) ক্ষেত্রে নিট অনুমোদনের হার শূন্য (০), যেখানে নিজেদের রক্ষণশীল বলে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই হার +৩১%।
অন্তর্নিহিত বিষয়: এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধিতা দেখা দিচ্ছে; আর সামনেই মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় আইনপ্রণেতারা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছেন।
কিছু এলাকায় এর ফলে ডেটা সেন্টার নির্মাণের কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে অথবা অন্তত ধীরগতিতে চলছে।
মরগান স্ট্যানলির ‘থিম্যাটিক রিসার্চ’ বিভাগের প্রধান মিশেল উইভার অ্যাক্সিওস-কে বলেন, “এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ক্ষেত্রে এটি আরেকটি বড় বাধা বা প্রতিবন্ধকতা।”
জরিপে দেখা গেছে, কারও বাড়ির কাছাকাছি এলাকায় ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা থাকলে এ বিষয়ে মানুষের নেতিবাচক মনোভাব আরও বেড়ে যায়।
প্রেক্ষাপট: প্রযুক্তি শিল্পে দীর্ঘকাল ধরেই নারী–পুরুষের অংশগ্রহণে ভারসাম্যহীনতা রয়েছে, তবে বর্তমানে তা যেন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
ব্যাংকটি শ্রমবাজারের বিষয়গুলো নিয়ে পর্যালোচনা করেনি, তবে লিঙ্কডইনের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে—উচ্চ বেতনের নতুন এআই-ভিত্তিক চাকরিগুলোর মধ্যে নারীরা পাচ্ছেন মাত্র এক-চতুর্থাংশ বা তারও কম। নির্বাহী পর্যায়ের পদগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ আরও কম।
এদিকে, এআই-এর অগ্রগতির ফলে প্রশাসনিক, করণিক এবং গ্রাহক সেবার মতো যেসব ক্ষেত্রে নারীদের আধিক্য বেশি, সেসব কাজের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ওলটপালট বা কর্মসংস্থান হ্রাসের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই প্রকট পার্থক্য নারী-পুরুষের বেতনের দীর্ঘদিনের বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
‘লিন-ইন’ (LeanIn)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) ব্রিজেট গ্রিসওয়াল্ড অ্যাক্সিওস-কে বলেন, “এআই-এর ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের এই ব্যবধানকে আমরা কোনোভাবেই একটি স্থায়ী ও গভীর খাদে পরিণত হতে দিতে পারি না।”
নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা এই সংগঠনটি দেখেছে যে, কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের জন্য নারীদের প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়তে হয় বা তাদের বিচার করা হয়, অথচ পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রশংসা করা হয়; এছাড়া দেখা গেছে, এআই প্রযুক্তি নিজেই নারীদের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ প্রদর্শন করে।
অতীতের চিত্র: এ বছরের শুরুর দিকে প্রকাশিত পিউ (Pew)-এর জরিপে দেখা গিয়েছিল, পুরুষদের তুলনায় নারীরা এআই প্রযুক্তির বিষয়ে বেশি সন্দিহান ছিলেন এবং পুরুষরাই এই প্রযুক্তি বেশি ব্যবহার করতেন।



































































