
একটি ইটের দৈর্ঘ্য বা ওজন মাপা সহজ, কিন্তু তার ভেতরের অতিপারমাণবিক কণাদের পরিমাপ চেনা নিয়মে অসম্ভব; আর এই অদৃশ্য জগতের রহস্য ভেদ করতেই জন্ম নিয়েছে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শাখা ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’।
মহাবিশ্বের যে রূপটি আমরা প্রতিনিয়ত দেখি— সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি, সমুদ্রের ঢেউ, পাহাড়ের ঝর্নার নদী হয়ে বয়ে চলা কিংবা শক্ত পাথরের দেয়াল এবং আরও কত কী— এসবই চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের (Classical Physics) চেনা নিয়মে বাঁধা। কিন্তু এই দৃশ্যমান বস্তুজগতের ঠিক নিচেই লুকিয়ে আছে অতিপারমাণবিক জগত (Realm), যা আমাদের বস্তবতায় ভিন্ন প্রকৃতির ও পুরাপুরি রহস্যময় হিসাবে ধরা দেয়। যেখানে আমাদের চেনা-জানা সকল যুক্তি অচল, এবং কণা ও তরঙ্গের সীমানা যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিজ্ঞানীদের চিরন্তন কৌতুহল থেকে জন্ম নেওয়া ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’ আমাদের এই অদৃশ্য জগতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। চেনা জগতের সীমানা পেরিয়ে আজ পদার্থবিজ্ঞান ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণাদের এক নিয়মতান্ত্রিক ও প্রমিত মডেল, যা মানবসভ্যতার এক অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক কৃতিত্ব।
বস্তুর পরিমাপ বনাম কণার মিথস্ক্রিয়া: বর্তমান দুনিয়ায় কোয়ান্টাম মেকানিক্স বৈজ্ঞানিক মহলে মূল চর্চিত বিষয়। এর বিষয়বস্তু খালি চোখে দেখা যায় না। আমরা বসবাস করি দৃশ্যমান জগতে এবং এখানের প্রতিটি বস্তুর পরিমাপ কিংবা মূল্য আমরা চোখে দেখে কিংবা হাতে ধরে নির্ধারণ করতে পারি; যেমন : একটা ইটের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, ওজন বা গুণগত মান যাচাইয়ের কাজটি কোনও সূক্ষ্ম যন্ত্রাদি ছাড়াই সম্পন্ন করা যায়। কিন্তু ইটের গাঠনিক প্রক্রিয়ায় যেসব ক্ষুদ্রকায় অতিপারমাণবিক মৌলকণা রয়েছে, তাদের ভর, বল বা গতিবেগ উল্লেখিত স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পন্ন করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন কণাদের অন্তঃক্রিয়া ও তরঙ্গ ধর্মের পর্যবেক্ষণ। আর এর অন্তঃপুরের অন্তঃপট ভাঙতে প্রয়োজন হবে বিভিন্ন প্রকার অণুবিক্ষণিক ও কণা ত্বরকের (Particle Accelerator) ন্যায় অতিকায় যন্ত্র।
তা করতে গিয়ে ১৯০০ সালে জার্মান পদার্থবিদ ম্যাক্স প্লাংক কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সূত্রপাত করেন। তবে প্লাংকের কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে পদার্থ ভাঙতে ভাঙতে কতটা ক্ষুদ্রস্তরে যাওয়া সম্ভব (গ্রিক সভ্যতা থেকে এখন পর্যন্ত এর এক সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে), তা জানতে হবে। নইলে পুরো বিষয়টি অস্পষ্ট থাকবে এবং মনে গেঁথে থাকার মতো স্বজ্ঞাত (Intuitive) হবে না। কেননা বিজ্ঞানের একটি সূত্রের জন্মই বহুবছরের ধারাবাহিক গবেষণার ফল হিসাবে। আর এসব ফলাফলে পক্ষ-বিপক্ষ উভয় মতামতই শক্তভাবে বিরাজ করে।
প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা থেকে পরমাণুবাদের উদ্ভব: এখানে সর্বপ্রথম গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাসের নাম আসে (খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০-৩৭০)। সবকিছুর শুরু ও সর্বশেষ অবস্থা নিয়েই মূলত তাঁর দার্শনিক চিন্তা আবর্তিত হতো— যেমন তিনি প্রশ্ন করেছেন যে, আকাশের শেষ কি দেয়ালের মতো কোনও শক্তস্থানের ওপর গিয়ে ঠেকেছে, নাকি কোনও শূন্যস্থানে। তদ্রূপ হলে সেই শেষের শেষটা কি পৌনঃপূনিক? তদ্রূপ বস্তুর সর্বশেষ ক্ষুদ্র অবস্থার প্রশ্নেও তিনি প্রস্তাব করেছেন যে, পদার্থকে ভাঙতে ভাঙতে এমন এক অবিভাজ্য কণা পাওয়া যাবে, যাকে আর ভাগ করা যাবে না। এই ধারণার সাথে তাঁর শিক্ষক লিউসিপাসও একমত ছিলেন। তাঁরা এর নাম দেন ‘অ্যাটম’ (Atom)। এটি ছিল পুরাপুরি একটি দার্শনিক যুক্তি, প্রমাণ করার মতো কোনও গাণিতিক সমীকরণ তাঁরা দিয়ে যাননি। তাই এই ধারণা বাতিল করে দেওয়ার তত্ত্ব দাঁড় করাও তাঁর পরবর্তী যুগে অসম্ভব ছিল না— যেমন তাঁর ১০০ বছর পর এরিস্টোটল ঠিক এর উল্টো ধারণা দেন। তিনি মনে করতেন পদার্থ একটি স্থায়ী ঘটনা, তা যতই কাটা হোক, এর কোনও শেষ বা আর কোনও একক ক্ষুদ্রাংশ মিলবে না। অতঃপর বাইশশো বছর ধরে পরমাণুবাদের পক্ষে ও বিপক্ষে দার্শনিকদের মধ্যে লাগাতার তর্ক চলেছে। কিন্তু কোনও পক্ষই ভৌত প্রমাণস্বরূপ তাঁদের যুক্তির পক্ষে কোনও শক্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি।
১৮০৩ সালের জন ডালটনের পরমাণুবাদ: প্রায় বাইশশোরও বেশি বছর পর ডেমোক্রিটাসের পরমাণুবাদকে ব্রিটিশ রসায়নবিদ জন ডাল্টন পরীক্ষামূলকভাবে বিজ্ঞানসম্মত রূপ দেন। তিনি প্রমাণ করেন যে, পদার্থ অত্যন্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অবিভাজ্য কণা বা পরমাণু দ্বারা গঠিত। ১৮০৩-সালে ডালটন দেখলেন যে, ২-ভাগ হাইড্রোজেনের সাথে ১-ভাগ অক্সিজেন মিশালেই পানি হয়। এই অনুপাত কখনও ১.৫ বা ২.৫ হয় না। অর্থাৎ প্রাকৃতিক এই ঘটনায় কোনও ভগ্নাংশ নাই। সুতরাং হাইড্রোজেন বা অক্সিজেন কেবল নিরেট দানাদার প্যাকেট বা পরমাণু হিসাবেই আসে। এরাই একত্রিত হয়ে বস্তুজগতের যাবতীয় অণু কিংবা ধাতু গঠন করে। যার বর্তমান রূপ দৃশ্যমান এই জগতের সমস্ত জড়বস্তু, বৃক্ষমণ্ডল, জীববৈচিত্র ও আমরা। উদাহরণ স্বরূপ :পরমাণু (Atom) ➔ অণু (Molecule) ➔ কোষীয় অঙ্গাণু ➔ কোষ (Cell) ➔ কলা/টিস্যু ➔ অঙ্গ (Organ) ➔ জীব (Organism)।
লাপ্লাসের নিয়তিবাদ ও ম্যাক্সওয়েলের অসীম তরঙ্গতত্ত্ব : উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে নিউটনীয় বলবিজ্ঞানের উৎকর্ষে অনুপ্রাণিত হয়ে ফরাসি বিজ্ঞানী মারকুইস দ্যা লাপ্লাস যুক্তি দেন যে, মহাবিশ্ব পুরাপুরি পূর্বনির্ধারিত (বৈজ্ঞানিক নিয়তিবাদী-Deterministic)। তাঁর মতে এমন একগুচ্ছ বৈজ্ঞানিক নিয়ম থাকা উচিৎ— যা দ্বারা ভবিষ্যতে ঘটতে যাওয়া সবকিছুরই পূর্বাভাস দেওয়া যাবে, যদি আমরা কোনও একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই মহাবিশ্বের হালচাল সম্পর্কে পুরাপুরি জানতে পারি। যেখানে “অনিশ্চয়তা” বা “সম্ভাবনা” বলতে কিছু থাকবে না! অতঃপর ১৮৬৫-সালে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল প্রমাণ করেন, আলো একটি তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ (Classical Electromagnetism), যা মহাশূন্যে নিরবচ্ছিন্নভাবে শক্তি ছড়ায়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, আলো বা তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ যে কোনও কম্পাঙ্কের (Frequency) হতে পারে। প্রকৃতিতে তরঙ্গকে তিনি একটি মসৃণ এবং অবিভাজ্য প্রবাহ মনে করতেন। এটা তখনকার ক্লাসিক বিজ্ঞানী লর্ড রেইলি ও জেমস জিন্স কোনও আপত্তি ছাড়াই ১০০% নিশ্চিত বলে মেনে নেন। এই অর্থে ধ্রুপদী যুগের বলবিজ্ঞান চলতো নিশ্চয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে। সেখানে ম্যাক্সয়েলের তাত্ত্বিকভাবে প্রমাণ করা তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ বড় ভূমিকা রেখেছিল!
রেইলি-জিন্সের সূত্র ও অতিবেগুনি বিপর্যয়: উনিশ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী লর্ড রেইলি ও জেমস জিন্স বিকিরণ সূত্রে বলেন যে, ম্যাক্সওয়েল বর্ণীত অনবরত তৈরি হওয়া তরঙ্গের সংখ্যা উচ্চ কম্পাঙ্কে অসীম হতে পারে এবং এর প্রতিটিকে সমান শক্তি দিতে হবে (Rayleigh-Jeans Law)। কোনও বস্তু উত্তপ্ত করলে কম্পাঙ্ক বৃদ্ধির সাথে সাথে (অর্থাৎ তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত ক্ষুদ্র হবে) তা থেকে নির্গত শক্তির পরিমাণও তত তীব্রভাবে বাড়তে থাকবে। এই তত্ত্বের প্রথম সঙ্কটটি ছিল— তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত ছোট হবে (যেমন অতিবেগুনি রশ্মি, এক্সরে বা গামা রশ্মি), এর বিকিরিত শক্তির পরিমাণ তত অসীমের দিকে ধাবিত হবে। দ্বিতীয়ত, এই গাণিতিক হিসাব যদি সত্যি হতো, তবে ঘরে একটি জ্বলন্ত মোমবাতি থেকেও অসীম পরিমাণের অতিবেগুনি রশ্মি ও এক্সরে নির্গত হয়ে চারপাশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা। তাঁদের সমীকরণ অনুযায়ী, উচ্চ-কম্পাঙ্কের দিকে বিকিরণের শক্তি ক্রমাগত বাড়তেই থাকে এবং যেহেতু কম্পাঙ্কের সীমা অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে, তাই মোট বিকিরিত শক্তির পরিমাণও গাণিতিকভাবে অসীম হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তব ল্যাবরেটরির পরীক্ষা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। তরঙ্গের শক্তি অসীম হওয়ার কারণ হলো, রিলেই ও জিন্স মহাশূন্যে বা কৃষ্ণবস্তুর ভিতরে “কতগুলো তরঙ্গ তৈরি হতে পারে“ এবং “প্রতিটি তরঙ্গ কতটুকু শক্তি বহন করতে পারে“— এই দুটি বিষয়কে ধ্রুপদী বা ক্লাসিক্যাল বলবিজ্ঞানের নিয়ম দিয়ে হিসাব করেছিলেন। পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে ক্লাসিকাল তত্ত্বের এই ব্যর্থতাকে বলা হয় ‘অতিবেগুনি বিপর্যয়’ (Ultraviolet Catastrophe)।
কিন্তু বাস্তব পরীক্ষায় দেখা যায় যে, তরঙ্গদৈর্ঘ্য খুবছোট বা কম্পাঙ্ক খুববেশি হলে শক্তির পরিমাণ অসীম হওয়া তো দূরের কথা, বরং তা নাটকীয়ভাবে শক্তি কমে শূন্যের কাছাকাছি নেমে যায়। মহাবিশ্বের কোনও উত্তপ্ত বস্তু থেকে মুহূর্তের মধ্যে অসীম শক্তি নির্গত হতে পারে না। কারণ প্রতিটি বস্তুরই শক্তির একটি নির্দিষ্ট ও সসীম পরিমাণ থাকে, যা অতিক্রম করা প্রকৃতির নিয়মে অসম্ভব। এমনকি একটি বিশাল নক্ষত্র বা কৃষ্ণগহ্বরের (Black Hole) মোট শক্তিও অসীম নয়— এগুলোও নির্দিষ্ট অণু, পরমাণু দিয়ে গঠিত। তাই চাইলেও এতে অসীম পরিমাণ তাপ বা শক্তি ধরে রাখা সম্ভব নয়। উল্লেখ্য শক্তির পরিমাণ বাড়াতে থাকলে একটি নির্দিষ্ট সীমার পর পরমাণুর ভেতরের বন্ধন ভেঙে যায় এবং বস্তুটির স্বাভাবিক গঠন থাকে না। অন্যদিকে মহাবিশ্বে শক্তির পরিমাণ নির্দিষ্ট। তাই একটি সীমিত ভরের বস্তু থেকে কখনও অসীম পরিমাণ শক্তি নির্গত হয় না। কারণ ভর ও শক্তি সমতুল্য, তাই কোনও উত্তপ্ত ভরের বস্তু থেকে অসীম শক্তি বের হবে না— যা অবিচ্ছিন্ন প্রবাহের মতো বইতে থাকবে! মূলত এই অসীম শক্তির অদ্ভুত ফলাফল এ কথাই প্রমাণ করেছে যে, প্রকৃতির অতিক্ষুদ্র মাইক্রোস্কোপিক বা পারমাণবিক স্তরের নিয়মগুলো ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে চিরায়ত (Classical) বলবিজ্ঞানে সীমাবদ্ধতা ছিল। কিন্তু বস্তুজগত সংক্রান্ত মানুষের কোনও তত্ত্বগত ব্যাখ্যার অক্ষমতা বাস্তবতার হিসাবকে অসীম করে দেয় না। এই ধারণায় উদ্বুদ্ধ বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাংক পরে শক্তির অবিচ্ছিন্ন প্রবাহের ধারণা ত্যাগ করে প্রস্তাব করেন যে, শক্তি নির্দিষ্ট কিছু ক্ষুদ্র প্যাকেটে বা ‘কোয়ান্টাম’ আকারে আদান–প্রদান হয়। তাঁর ‘কোয়ান্টাম তত্ত্ব’ আবিষ্কারের পর থেকে ক্লাসিক মেকানিক্স যুগের তাপগতিবিদ্যা থেকে উদ্ভূত পারমাণবিক “অসীম” শক্তি সমস্যার ক্রমশ সমাধান হতে শুরু করে এবং আধুনিক কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সূচনা ঘটে। অতঃপর এই কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের মাঝেই জন্ম হয় কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিক্স (QED), যা আলো (ফোটন) ও অন্যান্য উপ-পারমাণবিক কণাদের (ইলেকট্রন) মধ্যকার মিথস্ক্রিয়া ব্যাখ্যা করে।
ম্যাক্স প্লাংকের শক্তির প্যাকেট কোয়ান্টাম (১৯০০-সাল): ধ্রুপদী বিজ্ঞানের এই বিশৃঙ্খলায় উদ্বিগ্ন ম্যাক্স প্লাংক প্রচলিত নিয়ম ভাঙতে মরিয়া হয়ে উঠলেন। তিনি সমীকরণ মেলানোর এক ‘সাময়িক সাহায্য’ হিসেবে ধরে নেন যে, শক্তি অবিচ্ছিন্ন তরঙ্গের মতো নয়; বরং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তির প্যাকেট বা গুচ্ছ (Quanta) হিসাবে নির্গত হয়। শক্তির এই ক্ষুদ্রতম প্যাকেটকে বলা হয় ‘কোয়ান্টাম’ (Quantum, বহুবচনে Quanta), যা আলোর ক্ষেত্রে ফোটন (Photon) নামে পরিচিত। এই সমীকরণ মেলাতে তাঁর একটি ধ্রুবকের প্রয়োজন হয়, যা শক্তির প্যাকেটের (ফোটন) সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করে। প্লাংক দেখালেন যে, শক্তির প্রতিটি প্যাকেটের পরিমাণ সরাসরি এই তরঙ্গের কম্পাঙ্কের (Frequency-ν) ওপর নির্ভর করে। প্যাকেটের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য তিনি কম্পাঙ্কের (ν) সাথে একটি ধ্রুবক সংখ্যা গুণ করলেন— E = һ𝜈; এখানে 𝐸= ফোটনের শক্তি, 𝜈 (নিউ, গ্রিক শব্দ) = তরঙ্গের কম্পাঙ্ক এবং һ = প্লাংকের ধ্রুবক— এর মান দাঁড়ালো 6.626 x 10-34 J.s প্রায়। এই সমীকরণটিই মূলত চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের মোড় কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। এটি প্রমাণ করে যে, ফ্রিকোয়েন্সি যত বাড়বে, একক একটি শক্তির প্যাকেট বা কোয়ান্টাম তৈরি করতে তত বেশি শক্তির প্রয়োজন হবে। যেহেতু অতি উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির (অসীম) জন্য অত্যন্ত বিশাল শক্তির একক কোয়ান্টাম প্রয়োজন, তাই উত্তপ্ত বস্তুর পরমাণুগুলোর পক্ষে এত উচ্চ শক্তির প্যাকেট নির্গমন করার গাণিতিক সম্ভাবনা একদম কমে যায়। ফলে অতিবেগুনি বা তার চেয়ে উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সিতে শক্তির বিকিরণ অসীম না হয়ে শূন্যের কোঠায় নেমে আসে এবং প্রকৃতিতে অসীম শক্তির বিপর্যয় ঘটে না। প্লাংক শুরুতে ভাবেননি যে, এটি প্রকৃতির কোনও মৌলিক একক। তৎকালীন সমীকরণের সঙ্কট থেকে উত্তরণের সাময়িক উপায় বা সহায়ক চলক (জার্মান Hilfsgröße) হিসেবে তিনি এই ধ্রুবকটির নাম দিয়েছিলেন ‘һ’। পরবর্তীতে এই সাময়িক ‘সাহায্য’-ই বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধ্রুবকে পরিণত হয়।
প্লাংক কীভাবে প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র সংখ্যাটি বুঝতে পারলেন? বাস্তবে ‘һ’ ধ্রুবকের মান যে এত ক্ষুদ্র হবে, সে সম্পর্কে তিনি নিজেও শুরুতে পুরোপুরি অবগত ছিলেন না; ল্যাবরেটরির পরীক্ষার তথ্যকে ব্যাখ্যা করতে গিয়েই তিনি এটি আবিষ্কার করেন। তাঁর যুগে কৃষ্ণবস্তুর (Blackbody) বিকিরণ ছিল একটি সমাধানের অযোগ্য সমস্যা। প্রকাশ থাকে যে, কৃষ্ণবস্তু হলো পদার্থবিজ্ঞানের একটি কাল্পনিক বা আদর্শ বস্তু। যা তার ওপর আপতিত সব ধরনের তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ (যেমন— আলো, তাপ, এক্সরে ইত্যাদি) সম্পূর্ণভাবে শোষণ করে নিতে পারে। এটি কোনও আলো বা বিকিরণ প্রতিফলিত (Reflect) বা প্রতিসরিত (Transmit) করে না। তাই একটি আদর্শ কৃষ্ণবস্তুকে উত্তপ্ত করলে, তা থেকে বিভিন্ন কম্পাঙ্কের তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ বিকিরণ হতে পারে। কিন্তু তৎকালীন প্রচলিত বিজ্ঞান বা ধ্রুপদী পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে এই বিকিরণের বণ্টনটিকে কোনোভাবেই সমীকরণে মিলানো যাচ্ছিল না। এর মূল কারণ ছিল, তখনকার বিজ্ঞানীরা শক্তিকে একটি মসৃণ ও অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ বলে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু প্লাংক ঠিক উল্টো পথ বেছে নিলেন। তিনি একটি গাণিতিক অনুমিতি হিসেবে ধরে নেন, উত্তপ্ত কৃষ্ণবস্তুটি শক্তি অবিরাম বা অবিচ্ছিন্নভাবে যেকোনও পরিমাণে শোষণ বা বিকিরণ করে না। বরং শক্তি আদান-প্রদান হয় অত্যন্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সুনির্দিষ্ট প্যাকেট বা কোয়ান্টা হিসেবে। তিনি সমীকরণ দিলেন, প্রতিটি প্যাকেটের শক্তি : Е = һν; যেখানে Е = প্যাকেটের শক্তি, ν = কম্পাঙ্ক এবং ℎ = তাঁর ধ্রুবক। তবে প্লাংক শুধু সমীকরণ দিয়েই থেমে যাননি। তিনি ল্যাবরেটরিতে কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ থেকে প্রাপ্ত নিখুঁত পরীক্ষামূলক বক্ররেখার (Experimental Blackbody Curve) উপাত্তগুলোর মুখোমুখি হলেন। প্রথমে তিনি পরীক্ষামূলক ডেটার সাথে তাঁর সমীকরণটি মিলান (Empirical Fitting)। পরবর্তীতে ডিসেম্বর ১৯০০ সালে ডেটা ফিটিং-এর পেছনে শক্তির কোয়ান্টাইজেশনের তাত্ত্বিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়েই তিনি প্রমাণ করেন যে, এই ℎ-এর ক্ষুদ্রতার মান কোনও অনুমান-নির্ভর কিছু নয়। কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণের বাস্তব উপাত্ত থেকেই তিনি ইতিহাসের প্রথম বিজ্ঞানী হিসেবে এই ধ্রুবকটির অত্যন্ত নিখুঁত মান নির্ণয় করতে সক্ষম হন।
একটি কৃষ্ণবস্তু উত্তপ্ত করা হলো। অতঃপর দেখা হলো যে, কোন কম্পাঙ্কে কতটা শক্তি বিকিরিত হচ্ছে। ফলাফলটি গ্রাফে বসালে একটি বিশেষ ধরনের চূড়াযুক্ত বক্ররেখা পাওয়া যায়— ধরা যাক, অনুভূমিক অক্ষে বসানো হলো কম্পাঙ্ক (ν) এবং উল্লম্ব অক্ষে বিকিরণের তীব্রতা বসানো হলো। বক্ররেখাটির প্রকৃতি ছিল অত্যন্ত অদ্ভুত— কম কম্পাঙ্কের দিকে শক্তির তীব্রতা থাকে বেশ কম। তারপর কম্পাঙ্ক বাড়ার সাথে সাথে শক্তির তীব্রতা বাড়তে থাকে এবং একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে গিয়ে সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছায়। কিন্তু চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, কম্পাঙ্ক যখন আরও বাড়ানো হয় (অর্থাৎ তরঙ্গদৈর্ঘ্য অতিবেগুনি বা এক্সরের দিকে অত্যন্ত ছোট হতে থাকে), তখন শক্তির তীব্রতা অসীম হয় না; বরং তা কমতে কমতে শূন্যের কাছাকাছি চলে আসে। এটি দেখেই প্লাংক বুঝতে পেরেছিলেন যে, শক্তি কোনও মসৃণ ও অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ নয়। অতঃপর তিনি Е=һν প্রস্তাব করলেন, যার অর্থ (ν) কম্পাঙ্কের একটি শক্তির প্যাকেটের মান হবে һν। তাইলে һ-এর মান কত? প্লাংক һ-কে অজ্ঞাত সংখ্যা হিসেবে রেখে একটি তাত্ত্বিক বিকিরণ সমীকরণ তৈরি করলেন: এখানে 𝑇 = বস্তুর পরম তাপমাত্রা, ν= কম্পাঙ্ক, 𝑐= আলোর বেগ, 𝑘=বোল্টজম্যান ধ্রুবক এবং һ = তাঁর তখনকার অজানা ধ্রুবক। এবার ল্যাবরেটরির বাস্তব পরীক্ষার বক্ররেখার সাথে এই গাণিতিক সূত্রটি মেলানোর পালা। ধরা যাক, পরীক্ষায় ১৫০০ K তাপমাত্রায় একটি বাস্তব বক্ররেখা পাওয়া গেল। প্লাংক তাঁর সূত্রে һ-এর মান বসিয়ে হিসাব করলেন, এর মান 10−33 J.s ঘরের হলে বক্ররেখাটি একরকম হয়, আবার 10–34 J.s ঘরের হলে অন্যরকম হয়। অবশেষে নিখুঁত ডেটা ফিটিং-এর মাধ্যমে তিনি দেখলেন, һ-এর মান ঠিক 6.626 x 10˗34 J.s বসালে তাত্ত্বিক গ্রাফটি ল্যাবরেটরির বাস্তব বক্ররেখার সাথে হুবহু মিলে যায়! সেখান থেকেই বিজ্ঞান জগত লাভ করে প্রকৃতির অন্যতম মৌলিক ধ্রুবক বা প্লাংকের ধ্রুবক (һ≈ 6.626×10˗34 J⋅s)।
আইনস্টাইনের ভৌত বাস্তবতা ও ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক: মাক্স প্লাংক মনে করেছিলেন, শক্তির এই ক্ষুদ্রতম প্যাকেট (Quanta), কেবল কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণের সমীকরণ মেলানোর একটি সাময়িক গাণিতিক কৌশল। তিনি ভেবেছিলেন, শক্তি কেবল শোষণ বা বিকিরণের সময়ই প্যাকেটের রূপ নেয়। কিন্তু মহাশূন্যে ভ্রমণের সময় তা চিরায়ত নিয়মে তরঙ্গের মতোই ছড়িয়ে পড়ে। কেননা প্লাংক নিজেই নিজের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের বাস্তব গভীরতা তখনও পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছিলেন না। ঠিক এই জায়গাতেই ১৯০৫-সালে আলোক তড়িৎ-ক্রিয়া (Photoelectric Effect) সংক্রান্ত ঐতিহাসিক গবেষণাপত্রে আলবার্ট আইনস্টাইন এক বৈপ্লবিক সংযোগ ঘটান। প্লাংকের সেই গাণিতিক শক্তি-প্যাকেটকে মহাজাগতিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে আইনস্টাইন প্রমাণ করলেন, শক্তি বা আলো কেবল বিকিরণের সময় নয়, বরং ভ্রমণের সময়ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন কণার সমষ্টি বা ফোটন অবস্থায় থাকে। প্লাংকের গাণিতিক অনুমানকে আইনস্টাইন ভৌত বাস্তবতায় রূপ দেওয়ায় কোয়ান্টাম মেকানিক্স শুধু খাতা-কলমের সমীকরণ থেকে বাস্তব মহাবিশ্বের বিজ্ঞানে পরিণত হয়।
আইনস্টাইন তাঁর এই গবেষণাপত্রে দেখান যে, শক্তির পরিমাণ আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ব্যস্তানুপাতিক। অর্থাৎ, আলোর ফোটন কণার শক্তি এবং এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য একেঅপরের বিপরীতমুখী আচরণ করে— তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত বাড়ে বা প্রসারিত হয়, শক্তির পরিমাণ তত কমে; আর তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত ছোট হয়, শক্তির পরিমাণ তত তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়। গাণিতিকভাবে এই ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্কটি হলো: (E ∝ )। যেহেতু আমরা প্লাংকের সমীকরণ থেকে জানি E = h𝜈 এবং তরঙ্গের গতিসূত্র অনুযায়ী কম্পাঙ্ক ν = (এখানে c হলো আলোর বেগ এবং λ হলো তরঙ্গদৈর্ঘ্য)। সুতরাং পূর্ণাঙ্গ সমীকরণটি দাঁড়ায়: (E ∝ )।
আন্তর্জাতিক এককের (SI Unit) নিয়ম অনুযায়ী, আমরা যদি প্লাংকের ধ্রুবকের মান (h = 6.626 × 10⁻³⁴ J⋅s) এবং আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার (c = 3 × 10⁸ m/s) ধরে এই দুটি ধ্রুবক সংখ্যাকে গুণ করি, তবে একটি নির্দিষ্ট মান পাওয়া যায়। এই নির্দিষ্ট গুণফলকে যে কোনও আলোর নিজস্ব তরঙ্গদৈর্ঘ্য (λ) দিয়ে ভাগ করলেই একটি স্বাধীন ফোটনের আসল শক্তির পরিমাণ বেরিয়ে আসে। আইনস্টাইনের এই সূত্রটিই মূলত রেইলি-জিন্সের সেই ঐতিহাসিক ‘অতিবেগুনি বিপর্যয়’ রোধ করে। কারণ তরঙ্গদৈর্ঘ্য যখন চরম সীমার কাছাকাছি সংকুচিত হয়, তখন সেখানে শক্তি অসীম হয় না, বরং কোয়ান্টাম স্তরের নিজস্ব নিয়মে শক্তি ও তরঙ্গের এই ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্কটিই এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে।
১৯০৫ সাল— আলবার্ট আইনস্টাইনের যুগান্তকারী বছর (Miracle Year): কার্যত বিংশ শতাব্দীর শুরুর আগপর্যন্ত পরমাণু কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা ছিল। কেউ এর বাস্তব প্রমাণ দিতে পারেনি বলে তখন অব্দি এর পক্ষে সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। তৎকালীন অনেক বড় বড় বিজ্ঞানীও (যেমন— পদার্থবিদ আর্নস্ট মাখ বা রসায়নবিদ ভিলহেল্ম অস্টওয়াল্ড) পরমাণুর অস্তিত্বকে কেবল একটি ‘কাল্পনিক বা সুবিধাজনক তাত্ত্বিক হিসাব, বাস্তব কিছু নয়’ বলে মনে করতেন। অতঃপর দৃশ্যপটে আসেন তখনকার সুইস প্যাটেন্ট অফিসের একজন কর্মচারী, যার নাম আলবার্ট আইনস্টাইন। ১৯০৫ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত গবেষণা পত্র— “On the Motion of Small Particles Suspended in a Stationary Liquid” (ব্রাউনীয় গতির গাণিতিক হিসাব)-এর দ্বারা পরমাণুর অস্তিত্বের বাস্তব প্রমাণ দেন। এর ঠিক তিন বছর পর ১৯০৮ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী জঁ পের্যাঁ (Jean Perrin) ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে আইনস্টাইনের সেই গাণিতিক হিসাবের সত্যতা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করলে পরমাণুবাদের বিরোধিতাকারীদের সব তর্ক থেমে যায় এবং বিজ্ঞান সমাজ এককভাবে মেনে নেয় যে পরমাণুই বস্তুজগতের সর্বনিম্ন একক (তখনকার হিসাবে)।
আলোর কণা বা ফোটনের আবিষ্কার (Photoelectric Effect): প্লাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্বকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে আইনস্টাইন ১৯০৫ সালে তাঁর ঐতিহাসিক গবেষণা পত্র— ‘On a Heuristic Viewpoint Concerning the Production and Transformation of Light’ প্রকাশ করেন। এই গবেষণাপত্রে তিনি ‘আলোকতড়িৎ ক্রিয়া’ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ দেন যে, আলো কেবল তরঙ্গ নয়, এটি আসলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন শক্তির কণার স্রোত। পরবর্তীতে এই আলোক কণার নাম দেওয়া হয় ফোটন (Photon)। এই অসাধারণ বৈপ্লবিক আবিষ্কারের জন্যই তিনি ১৯২১ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
আলো যখন তরঙ্গ (Wave Nature): আলো যখন মহাশূন্য বা কোনও মাধ্যমের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করে (Propagation), তখন সে কণার মতো আচরণ না করে পুকুরের পানিতে ঢিল ছুড়লে তৈরি হওয়া তরঙ্গের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, যেমন : আলোর ব্যতিচার (Interference) ও অপবর্তন (Diffraction)। বিখ্যাত বিজ্ঞানী থমাস ইয়ং-এর দ্বি-চিড় পরীক্ষা (Double-slit experiment) এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এই পরীক্ষায় আলোকে যখন দুটি খুব কাছাকাছি থাকা সরু ছিদ্রের মধ্য দিয়ে পাঠানো হয়, তখন পর্দার ওপর আলো ও অন্ধকারের ডোরাকাটা দাগ (Interference fringe) তৈরি হয়। এটি কেবল তরঙ্গের পক্ষেই সম্ভব, কণার পক্ষে নয়। তবে বর্তমান কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আধুনিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আলো আসলে কণা বা তরঙ্গ কোনোটিই নয়, বরং এটি একটি কোয়ান্টাম ফিল্ড বা ক্ষেত্র। বিজ্ঞানী লুই ডি ব্রগলি প্রমাণ করেন যে, কেবল আলো নয়, মহাবিশ্বের যেকোনও গতিশীল কণারই (ইলেকট্রন বা প্রোটন) একটি নিজস্ব তরঙ্গধর্ম রয়েছে। যেটাকে গ্রিক বর্ণ ল্যামডা (λ) দ্বারা প্রকাশ করা হয়, বিষয়টি পরে আসছে।
অতিপারমাণবিক কণার যুগ (১৮৯৭-১৯৩২): উপরের আলোচনায় দেখা যায় যে, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই সন্দেহ দানা বেঁধেছিল যে, পরমাণু মোটের ওপর অবিভাজ্য (Indivisible) নয়। এর কয়েক বছর আগে ১৮৯৭-সালে ক্যামব্রিজের ট্রিনিটি কলেজের একজন ফেলো, জে জে থমসন ইলেক্ট্রন নামক এমন একটি কণার অস্তিত্ব প্রমাণ করেছিলেন, যার ভর (Mass) ছিল অতিশয় কম— হাইড্রোজেন পরমাণুর ভরের ১০০০ থেকে ১৮০০ গুণ হালকা। তিনি এই পরীক্ষায় টেলিভিশনের পিকচার টিউবের (ক্যাথোড রে টিউব) মতো একটা সেটআপ ব্যবহার করেছিলেন : যেখানে একটি লাল তপ্ত ধাতব ফিলামেন্ট থেকে ইলেকট্রন নির্গত হয় এবং যেহেতু এগুলোর (ইলেকট্রন) ঋণাত্বক চার্জ রয়েছে, সেহেতু একটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করে সেগুলোকে একটি ফসফর লেপিত পর্দার (phosphor-coated screen) দিকে তীব্র বেগে ছুটতে দেওয়া হয়। যখন সেগুলো পর্দার ওপর আঘাত করে, তখন আলোর ঝলকানি তৈরি হয়। সাথে সাথে এটি বোঝা যায় যে, এই ইলেক্ট্রনগুলো নিশ্চয়ই খোদ পরমাণুর ভিতর থেকেই আসছে। ১৯০৪ সালে তিনি পরমাণুর “কিশমিশ পুডিং” বা “তরমুজ মডেল” (Plum Pudding Model) প্রস্তাব করেন। তাঁর মতে, পরমাণু হলো একটি ধনাত্মক আধানের গোলক, যার মধ্যে ঋণাত্মক ইলেকট্রনগুলো তরমুজের বিচির মতো গেঁথে থাকে। এর আগে ডাল্টন বলেছিলেন যে, পরমাণু অবিভাজ্য, যা থমসনের এই পরীক্ষায় ভুল প্রমাণিত হয়। এই আবিষ্কারের ফলেই পরমাণুর গঠন, বিদ্যুৎ পরিবাহিতা এবং রাসায়নিক বন্ধনের আসল রহস্য উন্মোচিত হয়।
নিউক্লিয়াস আবিষ্কার: নিউজিল্যান্ডের বিজ্ঞানী আর্নেস্ট রাদারফোর্ড পরমাণু একটি ধনাত্মক আধানের গোলক এবং ইলেকট্রন সেখানে স্বল্পাকারে লেগে আছে, তা পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখেন যে, পরমাণুর একটি অভ্যন্তরীণ গঠন রয়েছে। তিনি ১৯১১-সালে এই পরীক্ষায় একটি আশ্চর্যজনক কাজ করে ফেলেন। একটি অতিশয় পাতলা সোনার পাতের ওপর তিনি তেজস্ক্রিয় আলফা কণা (ভারী ধনাত্মক কণা) দিয়ে তীব্র গতিতে বর্ষণ করলেন। রাদারফোর্ডের বিশ্বাস ছিল হয়তো ভারী আলফা কণাগুলো সোনার পাতকে ভেদ করে সোজা ওপাশে চলে যাবে। বাস্তবে ৯৯% কণা সোজা চলে গেল। যা প্রমাণ করে যে, পরমাণুর ভেতরের ৯৯.৯৯% জায়গাই সম্পূর্ণ ফাঁকা কুয়াশাময়! কিন্তু সবচে’ বড় চমক ছিল, প্রতি ২০,০০০টি কণার মধ্যে মাত্র ১টি কণা সোনার পাতের একদম মাঝখানে ধাক্কা খেয়ে ঠিক ১৮০ ডিগ্রি কোণে পেছনের দিকে ফিরে আসে! বিস্ময় নিয়ে এই ঘটনাকে রাদারফোর্ড বলেছিলেন, “এটি এমন যেন আপনি একটি কাগজের টুকরোর ওপর ১৫ ইঞ্চির একটি কামানের গোলা ছুঁড়েছেন, আর সেই গোলাটি কাগজ থেকে ধাক্কা খেয়ে উল্টো আপনার বুকেই আছড়ে পড়েছে!” এই পরীক্ষা থেকে তিনি আবিষ্কার করলেন যে, পরমাণুর ঠিক মাঝখানে একটি শক্ত ও ভারী ধনাত্মক কেন্দ্রবিন্দু লুকানো রয়েছে, যার নাম নিউক্লিয়াস। আর এই কেন্দ্রককে ঘিরেই ইলেকট্রন সৌরজগতের গ্রহের মতো আবর্তন করছে। প্রোটন গ্রিক শব্দ First থেকে নেওয়া, কেননা তখন বিশ্বাস করা হতো যে, এটাই সেই মৌলিক একক, যা দিয়ে সমস্ত পদার্থ তৈরি।
রাদারফোর্ড থেকে নেইলস বোর: রাদারফোর্ডের মডেলে একটি বড় ত্রুটি ছিল। ধ্রুপদী তড়িৎ-চৌম্বকীয় তত্ত্ব (Maxwell’s Theory) অনুযায়ী, ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রন অনবরত শক্তি বিকিরণ করবে এবং সর্পিলাকার পথে একসময় নিউক্লিয়াসে পতিত হবে। অর্থাৎ পরমাণু স্থায়ী হবে না। বোর (যিনি রাদারফোর্ডের সাথেও কাজ করেছেন) এই সমস্যার সমাধান করতে ম্যাক্স প্লাংকের কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাহায্য নেন। তিনি বলেন, ইলেকট্রনের কক্ষপথ এবং কৌণিক ভরবেগ কোয়ান্টায়িত (𝑚𝑣𝑟=𝑛ℎ/2𝜋) যার কারণে ইলেকট্রন নির্দিষ্ট কক্ষপথে থাকা অবস্থায় শক্তি হারায় না। তিনি জানান, ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসের চারপাশে যেকোনও কক্ষপথে ঘুরতে পারে না, বরং নির্দিষ্ট কিছু অনুমোদিত বৃত্তাকার স্থির কক্ষপথে (Energy Levels) ঘোরে এবং এই কক্ষপথে থাকাকালীন তারা কোনও শক্তি বিকিরণ বা শোষণ করে না। তবে ইলেকট্রন যখন একটি শক্তিস্তর থেকে অন্য একটি স্তরে যায়, তখন শক্তির পার্থক্য অনুযায়ী ফোটন শোষণ বা নির্গত হয়।
ΔE=hν অর্থাৎ E2– E1 = hν এবং এ কারণেই পরমাণু নির্দিষ্ট প্রকারের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো নির্গত করে— যার ফলে রেখা বর্ণালী তৈরি হয়।
বোরের এই মডেল হাইড্রোজেন পরমাণুর ক্ষেত্রে অসাধারণ হলেও তা বহু-ইলেকট্রনকে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে না। কারণ হলো— যখন পরমাণুতে একাধিক ইলেকট্রন থাকে, তখন শুধুই নিউক্লিয়াসের সাথে ইলেকট্রনের আকর্ষণ বল কাজ করবে না, বরং ইলেকট্রনগুলোর নিজেদের মধ্যেও একটি তীব্র বিকর্ষণ বল কাজ করবে। বোরের সরল গাণিতিক মডেলে এই আন্তঃইলেকট্রন বিকর্ষণকে হিসাব করার কোনও সুযোগ ছিল না।। দ্বিতীয়ত, ইলেকট্রন নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরে বলে ধরে নেওয়া আধুনিক কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি এবং শ্রোডিঞ্জারের তরঙ্গ সমীকরণ তা বাতিল করে দেয়। এ বিষয় নিচে আসছে। তৃতীয়ত, বোরের মডেলে বাস্তব অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও নিউট্রনের প্রসঙ্গ আসেনি। কিন্তু এটা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বিজ্ঞানীদের সামনে পরমাণুর ভর সংক্রান্ত যে নতুন সংকট তৈরি হয়, তার সমাধানেই নিউট্রন আবিষ্কৃত হয়।
নিউট্রন আবিষ্কার: কেমব্রিজে রাদারফোর্ডের একজন সহকর্মী, জেমস চ্যাডউইক নিউক্লিয়াসের মধ্যে নিউট্রন নামক আরেকটি কণার অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন। রাদারফোর্ডের পরমাণুর কেন্দ্র নিউক্লিয়াস আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন যে, নিউক্লিয়াস কেবল প্রোটন দিয়েই গঠিত এবং সকল পদার্থ সৃষ্টির মৌলিক একক। কিন্তু তাতে আরেক ঝামেলা দেখা যায় যে, কেবল প্রোটনকে হিসাব করে পরমাণুর মোট ভর মিলছে না— প্রোটনের উপস্থিতি সত্ত্বেও পরমাণুর মোট ভর আরও বেশি হচ্ছিল; যে অতিরিক্ত ভর প্রায় প্রোটনের সমান। এই বাড়তি ভর নিয়ে প্রশ্ন জাগে। অতঃপর জেমস চ্যাডউইক ১৯৩২-সালে এই সমস্যা নিয়ে গবেষণা করে নিউট্রন কণা আবিষ্কার করেন। এই কণা প্রোটনের ভরের কাছাকাছি এবং সম্পূর্ণভাবে বৈদ্যুতিক চার্জমুক্ত এবং প্রোটনের সাথে জোড়া বেঁধে পরমাণুর কেন্দ্রে অবস্থান করে। তাঁর এই আবিষ্কারের জন্য তিনি নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন। প্রোটন ও নিউট্রনের এই জোড়ার প্রতিটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় নিউক্লিয়ন বলা হয়।
১৯১৩-সালে নেইলস বোরের পরমাণু মডেল ছিল আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের একটি বিশাল মাইলফলক। কিন্তু আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে, ইলেকট্রনকে একটি নির্দিষ্ট বৃত্তাকার পথে ঘূর্ণায়মান কণা হিসেবে বিবেচনা করার কারণে এটি আধুনিক কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সাথে পুরোপুরি খাপ খাচ্ছিল না। তাঁর এই সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করে পরমাণুর আধুনিক রূপ বা কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল মডেল তৈরিতে ১৯১৩ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে চারজন বিজ্ঞানী সবচেয়ে যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন। বোর মডেল থেকে আধুনিক মডেলে উত্তরণের সেই বিজ্ঞানীদের অবদান নিচে ক্রমানুসারে আলোচনা করা হলো।
আর্নল্ড সমারফেল্ড (১৯১৬)— উপবৃত্তাকার কক্ষপথ ও সূক্ষ্ম বর্ণালী: বোর মডেলের প্রথম বড় সংশোধনটি আনেন জার্মান পদার্থবিদ সমারফেল্ড। বোর ধরে নিয়েছিলেন ইলেকট্রনের কক্ষপথগুলো কেবল নিখুঁত বৃত্তাকার [Sommerfeld’s Extension]। কিন্তু উচ্চ ক্ষমতার বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা গেল বোরের একেকটি একক বর্ণালি রেখা আসলে কয়েকটি অতি সূক্ষ্ম রেখার সমষ্টি। তিনি প্রস্তাব করেন যে, প্রধান শক্তিস্তরের প্রথম কক্ষপথটি বৃত্তাকার হলেও পরবর্তী উচ্চতর স্তরগুলোতে ইলেকট্রন উপবৃত্তাকার (Elliptical) পথেও ঘুরতে পারে। এই উপবৃত্তাকার কক্ষপথের ধারণাই মূলত প্রধান শক্তিস্তরের ভিতরে উপ–শক্তিস্তর বা অরবিটালের (s, p, d, f) জন্ম দেয়। এর ফলে বোরের একক রেখাগুলোর সূক্ষ্ম রেখায় বিভক্ত হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়।
লুই ডি ব্রগলি (১৯২৪)— ইলেকট্রনের কণা–তরঙ্গ দ্বৈততা: বোর ইলেকট্রনকে কেবল একটি আধানযুক্ত কণা বা বিলিয়ার্ড বলের মতো বিবেচনা করেছিলেন। কিন্তু ফরাসি যুবরাজ ও বিজ্ঞানী লুই ডি ব্রগলি পদার্থের এক বৈপ্লবিক রূপ উন্মোচন করেন। আইনস্টাইন যেমন প্রমাণ করেছিলেন আলোর কণা ধর্ম ও তরঙ্গ ধর্ম দুই-ই আছে [Einstein’s Photoelectric Effect], ডি ব্রগলি বললেন যে, ইলেকট্রনের মতো গতিশীল বস্তুকণারও তরঙ্গ ধর্ম (Wave Nature) রয়েছে। তিনি সমীকরণ দেন: λ= h/mν। ডি ব্রগলির এই তত্ত্ব বোরের মডেলে ইলেকট্রনের সুনির্দিষ্ট স্থায়িত্বের বাস্তব ব্যাখ্যা দেয়। ইলেকট্রন যখন ঘোরে, তখন সে একটি স্থির তরঙ্গ (Standing Wave) তৈরি করে। এই তরঙ্গটি যদি কক্ষপথের পরিধির সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যায়, কেবল তখনই সেই কক্ষপথটি স্থায়ী হয়।
ওয়ের্নার হাইজেনবার্গ (১৯২৭)— অনিশ্চয়তা নীতি: বোর মডেলে ইলেকট্রনের নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধ (অবস্থান) ও নির্দিষ্ট বেগ (ভরবেগ) একই সাথে নিখুঁতভাবে হিসাব করা হয়েছিল। যা ছিল লাপ্লাসের নিয়তিবাদের মতো শতভাগ নিশ্চিত। কিন্তু জার্মান বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ এই নিশ্চয়তাবাদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকিয়ে দেন। হাইজেনবার্গ তাঁর বিখ্যাত অনিশ্চয়তা নীতি দিয়ে প্রমাণ করেন যে, পরমাণুর অতি ক্ষুদ্র স্তরে কোনও কণার অবস্থান এবং ভরবেগ একই সাথে নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা প্রকৃতিগতভাবেই অসম্ভব। এই নীতিটি বোর মডেলের “নির্দিষ্ট বৃত্তাকার কক্ষপথের (Orbit)” ধারণাকে চিরতরে বাতিল করে দেয়। কারণ ইলেকট্রন যদি নির্দিষ্ট পথেই ঘোরে, তবে তার অবস্থান ও ভরবেগ উভয়ই নিশ্চিতভাবে জানার কথা, যা প্রকৃতির নিয়মবিরোধী।
এরউইন শ্রোডিঞ্জার (১৯২৬)— ক্লাউড বা অরবিটাল মডেল: হাইজেনবার্গ এবং লুই ডি ব্রগলির তরঙ্গ তত্ত্বকে একত্রিত করে অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ এরউইন শ্রোডিঞ্জার পরমাণু বিজ্ঞানের চূড়ান্ত গাণিতিক রূপটি দাঁড় করান। তিনি ইলেকট্রনকে কণা হিসেবে দেখার চিন্তা পুরোপুরি বাদ দিয়ে একে একটি ত্রিমাত্রিক তরঙ্গ হিসেবে কল্পনা করেন এবং একটি জটিল ব্যবকলনীয় সমীকরণ (Schrödinger Wave Equation) তৈরি করেন: Ȟψ=Eψ। এই সমীকরণ সমাধানের মাধ্যমে বোরের নির্দিষ্ট কক্ষপথের (Orbit) ধারণাটি প্রতিস্থাপিত হয় “অরবিটাল” (Orbital) বা ইলেকট্রন মেঘ (Electron Cloud) ধারণা দ্বারা। অরবিটাল হলো নিউক্লিয়াসের চারপাশে এমন একটি ত্রিমাত্রিক এলাকা, যেখানে ইলেকট্রন পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি (৯৫% পর্যন্ত)।
প্রথম প্রতিকণার ধারণা ও প্রতিপদার্থের সন্ধান (১৯২৮–১৯৩২): অতিপারমাণবিক কণার জগতে যখন ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রনের মতো সাধারণ কণা আবিষ্কারের ধুম লেগেছিল, ঠিক তখনই কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানে এক অবিশ্বাস্য তাত্ত্বিক মোড় আসে। ১৯২৮ সালে ব্রিটিশ তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী পল ডিরাক কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সাথে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মিলন ঘটিয়ে ইলেকট্রনের আচরণের জন্য একটি গাণিতিক সমীকরণ তৈরি করেন, যা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘ডিরাক সমীকরণ’ (Dirac Equation) নামে পরিচিত: (iℏγμ∂μ–mc)ψ=0
গণিতের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী যেমন কোনও সংখ্যার বর্গমূল করলে দুটি উত্তর পাওয়া যায় (একটি ধনাত্মক ও একটি ঋণাত্মক), তেমনই ডিরাক সমীকরণটি সমাধান করতে গিয়েও তিনি ইলেকট্রনের শক্তির দুটি রূপ দেখতে পান। একটি ছিল আমাদের চেনা ঋণাত্মক চার্জযুক্ত সাধারণ ইলেকট্রন, কিন্তু অন্যটি নির্দেশ করছিল ঠিক ইলেকট্রনের সমান ভর ও স্পিনযুক্ত অথচ বিপরীত। এর মানে ধনাত্মক চার্জযুক্ত সম্পূর্ণ নতুন এক কণার অস্তিত্ব! শুরুতে বিজ্ঞানীদের মনে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও ১৯৩১ সালে পল ডিরাক দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন যে এটি মূলত সাধারণ পদার্থের বিপরীত এক রূপ, যা মহাবিশ্বের প্রথম ‘প্রতিকণা’ (Antiparticle)। পরবর্তী সাল ১৯৩২-এ যুক্তরাষ্ট্রের পদার্থবিজ্ঞানী কার্ল অ্যান্ডারসন ক্লাউড চেম্বারে মহাজাগতিক রশ্মি (Cosmic Rays) পরীক্ষা করার সময় ল্যাবরেটরিতে এই কণাটির বাস্তব সন্ধান পান এবং নাম দেন ‘পজিট্রন’ (Positron) বা অ্যান্টি-ইলেকট্রন। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ পল ডিরাক ১৯৩৩ সালে এবং কার্ল অ্যান্ডারসন ১৯৩৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। ডিরাকের এই প্রতিকণার ধারণাই পরবর্তীতে প্রাথমিক কণার স্ট্যান্ডার্ড মডেলে অ্যান্টি-কোয়ার্ক বা লেপ্টনদের মতো প্রতিপদার্থের সম্পূর্ণ পরিবারটি যুক্ত করতে মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
পল ডিরাক থেকে রিচার্ড ফাইনম্যান: পল ডিরাকের সমীকরণটি ছিল মূলত একটি একক কণার জন্য। কিন্তু বাস্তবে কণাগুলো যখন পথ চলে, তখন তারা ক্রমাগত আলো বা তড়িৎচৌম্বকীয় বলের সাথে শক্তি বিনিময় করে। ডিরাক সমীকরণের এই জটিল হিসাবনিকাশকে সাধারণ মানুষের বোঝার উপযোগী করে তুলতে ১৯৪০-সালে দৃশ্যপটে আসেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান। তিনি কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সাথে তড়িৎচৌম্বকীয় বলের এক অপূর্ব মিলন ঘটান; যার নাম কোয়ান্টাম তড়িৎগতিবিদ্যা (Quantum Electrodynamics – QED)। এই যুগান্তকারী কাজের জন্য ১৯৬৫ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল, তিনি পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা কঠিন গাণিতিক সমীকরণগুলোকে এক নিমিষেই সহজ কিছু ছবির মাধ্যমে প্রকাশ করলেন, যা বিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘ফাইনম্যান ডায়াগ্রাম’ (Feynman Diagrams) নামে পরিচিত। একটি ইলেকট্রন ও পজিট্রন মহাশূন্যে কীভাবে ছুটে এসে পরস্পর ধাক্কা খাচ্ছে, কীভাবে শক্তি বিনিময় করছে কিংবা সংঘর্ষের পর একেঅপরকে ধ্বংস করে আলোতে রূপান্তরিত হচ্ছে— এই পুরো জটিল ঘটনাটি ফাইনম্যান মাত্র কয়েকটি বাঁকা রেখা আর তীরের ছবি দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন। ফাইনম্যানের এই সহজ ছবির যুক্তিই প্রমাণ করে যে, ডিরাকের সমীকরণ থেকে পাওয়া প্রতিকণা বা প্রতিপদার্থের ধারণাটি কেবল তাত্ত্বিক কোনও কাল্পনিক হিসাব নয়। বরং এটিই আমাদের বাস্তব মহাবিশ্বের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।
১৯৬৪ সাল থেকে বর্তমান কোয়ার্ক ও স্ট্যান্ডার্ড মডেল: বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে প্রোটন ও নিউট্রনও মৌলিক কণা নয়, এরা ‘কোয়ার্ক’ নামের আরও ক্ষুদ্র কণা দিয়ে তৈরি। এগুলো হলো, কোয়ান্টাম কণা। এদের বিন্যাসকে সাজিয়ে তৈরি হয় আধুনিক ‘প্রাথমিক কণাদের প্রমিত মডেল’ (Standard Model)। নিচে এই মডেলের চিত্রটি লক্ষ করুন:

স্ট্যান্ডার্ড মডেলের এই সারণীটি মূলত কণা ও প্রতিকণার (Antiparticles) একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রদর্শন করে, যা আমাদের আধুনিক মহাবিশ্ব গঠনে মূল ভূমিকা রেখেছে। এখানে রয়েছে— ছয়টি কোয়ার্ক ও তাদের প্রতিকোয়ার্ক, ছয়টি লেপ্টন ও তাদের প্রতিলেপ্টন, ডব্লিউ প্লাস (W+), ডব্লিউ মাইনাস (W–) ও জেড (Z) বোসন, আটটি গ্লুয়ন, একটি ফোটন এবং একটি হিগস বোসন।
তবে ইলেক্ট্রোউইক প্রতিসাম্য (Electroweak Symmetry) ভেঙে যাওয়ার পূর্বে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের এই গঠনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। এটি মূলত মহাবিশ্ব সৃষ্টির একেবারে শুরুর মুহূর্তের (বিগ ব্যাং-এর মাত্র এক সেকেন্ডের কোটি ভাগের এক ভাগ পরের) একটি চরম নাটকীয় পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ইলেক্ট্রোউইক সিমেট্রি ব্রেকিং’ (Electroweak Symmetry Breaking) বলা হয়। বিষয়টি সহজে বুঝতে নিচের তিনটি পয়েন্ট লক্ষ করা যাক:
প্রথমত, বর্তমান মহাবিশ্ব বনাম আদি মহাবিশ্ব : উপরিউক্ত স্ট্যান্ডার্ড মডেলে আমরা যে ১৭টি মৌলিক কণা দেখতে পাই (কোয়ার্ক, লেপ্টন, বোসন ইত্যাদি), সৃষ্টির শুরুতে কিন্তু মহাবিশ্ব এমন ছিল না। চরম তাপমাত্রা ও শক্তির কারণে তখন কণাগুলোর বৈশিষ্ট্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
দ্বিতীয়ত, বলের একত্রীকরণ (Unified Forces): স্ট্যান্ডার্ড মডেলে আমরা যে মৌলিক বলগুলো দেখি, তার মধ্যে তড়িৎচৌম্বকীয় বল (আলো ও বিদ্যুতের জন্য দায়ী) এবং দুর্বল নিউক্লীয় বল (তেজস্ক্রিয়তার জন্য দায়ী) আদি মহাবিশ্বে আলাদা ছিল না। বরং তারা একসাথে মিশে একটি একক বল হিসেবে কাজ করতো, যাকে বলা হয় ‘ইলেক্ট্রোউইক বল’।
তৃতীয়ত, কণাগুলোর আদি রূপ এবং ভরহীন অবস্থা: ইলেক্ট্রোউইক প্রতিসাম্য বজায় থাকাকালীন মহাবিশ্বের কণাগুলোর কোনও ভর (Mass) ছিল না। ইলেকট্রন, কোয়ার্ক সবকিছুই তখন ভরহীন অবস্থায় আলোর গতিতে ছুটে বেড়াতো! আজকের চেনা ফোটন, W বা Z বোসনের অস্তিত্ব তখন ছিল না। পরিবর্তে চারটি ভিন্ন ধরনের ভরহীন গেজ বোসন (W1, W2, W3, B0) সক্রিয় ছিল। হিগস বোসন কণাটি তখনও একটি একক কণা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেনি। অতঃপর মহাবিশ্ব যখন কিছুটা ঠান্ডা হয়, তখন সহসা হিগস ক্ষেত্র (Higgs Field) সক্রিয় হয় এবং সেই ইলেক্ট্রোউইক প্রতিসাম্য ভেঙে যায়। হিগস ক্ষেত্র সক্রিয় হওয়ার সাথে সাথে কণাগুলো এর সাথে মিথস্ক্রিয়া বা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে ভর লাভ করতে শুরু করে। একই সাথে আদিম সেই চারটি বলবাহী কণা নিজেদের ওলটপালট করে আজকের চেনা ভারী W+, W–, Z বোসন এবং সম্পূর্ণ ভরহীন ফোটনে (আলোর কণা) রূপান্তরিত হয়। মোটকথা, আজ আমরা স্ট্যান্ডার্ড মডেলে যে কণাগুলোর তালিকা দেখি, তা আসলে মহাবিশ্ব ঠান্ডা হওয়ার পর তৈরি হওয়া একটি রূপ মাত্র। সৃষ্টির একদম শুরুতে এই কণাগুলোর কোনও ভর ছিল না এবং এদের বিন্যাস ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম এক একক ও অনন্য অবস্থায়। অতঃপর সেই প্রাথমিক কণাদের দ্বারাই পরমাণু, অণু, গ্যাসীয় নেবুলা, নক্ষত্র, ব্ল্যাকহোল, গ্রহ ছাড়াও আরও নানাবিধ জ্ঞাত ও অজ্ঞাত মহাজাগতিক বস্তু অস্তিত্বে এসেছে। কিন্তু এসব বস্তুকণাদের এমন কীসব সহজাত বৈশিষ্ট্য ছিল, যার সাহায্যে এই মহাজগত অস্তিত্বে এলো? এর উত্তর খুঁজে দেখতে গিয়েই তৈরি হয় উপরিউক্ত প্রাথমিক কণাদের প্রমিত মডেল (Standard Model of Elementary particles)।
কোয়ার্ক— মারে-গেলম্যানের যুগান্তকারী প্রস্তাব: ১৯৩২ সালে চ্যাডউইকের নিউট্রন অবিষ্কারের পর মানুষ ভেবেছিল যে, মৌলিক কণার তালিকা প্রস্তুত শেষ। কিন্তু ১৯৬৪-সালে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (Caltech)-এর বিজ্ঞানী মারে-গেলম্যান এক বৈপ্লবিক প্রস্তাব দিলেন যে, প্রোটন আর নিউট্রন আসলে বিন্দুর মতো নিরেট কিছু নয়। মারে-গেলম্যানের সাথে আরেকজন বিজ্ঞানী ছিলেন জর্জ জিউইং। তাঁদের প্রস্তাব পুরাপুরি গাণিতিকভাবে তাত্ত্বিক হওয়ায়, সেটা ভবিষ্যতে প্রমাণযোগ্য ছিল। এর চার বছর পর ১৯৬৮-সালে বিজ্ঞানীরা প্রোটনের ভিতরের অবস্থা দেখার জন্য থমসনের ইলেকট্রন আবিষ্কারে ক্যাথোড টিউব ব্যবহারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তৈরি করলেন এক বিশাল লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর বা কণা ত্বরক যন্ত্র। সেই পরীক্ষার নাম Deep Inelastic Scattering দেওয়া হয়।
কোয়ার্ক শনাক্তকরণ: এই ল্যাব পরীক্ষায় দেখা গেল ইলেকট্রনগুলো প্রোটনের ভিতর দিয়ে সোজা পার না হয়ে এর মাঝ বরাবর ৩টি শক্ত বিন্দুর সাথে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে যাচ্ছে! পরীক্ষার পদ্ধতিটা ছিল, আলোর কাছাকাছি গতিতে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইলেকট্রনের একটি স্রোত প্রোটনের দিকে ছুঁড়ে মারা। ইলেকট্রন ব্যবহারের কারণ হলো, এগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং প্রোটনের ভিতরের গঠনকে না ভেঙে, ভিতরে এক্স-রের মতো প্রবেশ করতে পারে। তাতে দেখা যায় যে, বেশিরভাগ ইলেকট্রন সোজা চলে গেল, কিন্তু কিছু ইলেকট্রন প্রোটনের মধ্যে নির্দিষ্ট তিনটি বিন্দুতে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে বিকট কোণে ছিটকে এলো। ইলেকট্রনগুলো যেভাবে প্রোটনের ভিতর থেকে ছিটকে আসছিল, সেই কোণ ও গতিশক্তি (Scattering Data) কম্পিউটারে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে, প্রোটনের মধ্যে ৩টি অত্যন্ত ক্ষুদ্র, শক্ত ও বিন্দু-সদৃশ কেন্দ্র বা কণা রয়েছে (শুরুতে একে বিজ্ঞানীরা ‘পার্টন’ বলেছিলেন, যা পরে কোয়ার্ক হিসেবে প্রমাণিত হয়)। অতঃপর এই কণাগুলোর বৈদ্যুতিক চার্জ হিসাব করে দেখা গেল সেগুলো পূর্ণ সংখ্যা নয় (যেমন -১ বা +১ নয়)। বরং সেগুলো ভগ্নাংশ, যা মারে গেল-ম্যানের তাত্ত্বিক কোয়ার্কের চার্জের (+2/3) এবং (-1/3) সাথে হুবহু মিলে যায়। আরও দেখা যায় যে, প্রোটনে রয়েছে, ২টি আপ কোয়ার্ক (+2/3, +2/3) ও ১টি ডাউন কোয়ার্ক (-1/3) = মোট চার্জ +১। এবং নিউট্রনে রয়েছে, ১টি আপ কোয়ার্ক (+2/3) ও ২টি ডাউন কোয়ার্ক (-1/3, -1/3) = মোট চার্জ ০। (স্মর্তব্য কোয়ার্কের বিস্তারিত ছবি স্ট্যান্ডার্ড মডেলে দেখুন।)
কোয়ার্ক আবিষ্কার টিম: উক্ত পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে ছিল MIT ও SLAC-এর বিজ্ঞানীদের একটি যৌথ দল। যার নেতৃত্বে ছিলেন তিনজন নাম করা পদার্থ বিজ্ঞানী রিচার্ড টেইলর, জেরোম ফ্রিডম্যান ও হেনরি কেন্ডাল। এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯০ সালে এই তিন বিজ্ঞানী যৌথভাবে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তবে ইতোপূর্বে মারে-গেলম্যান কণাদের একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মে সাজিয়ে শৃঙ্খলা আনেন, যাকে Eightfold Way বলা হয়। কণা পদার্থবিজ্ঞানে সামগ্রিক তাত্ত্বিক শৃঙ্খলা ও আবিষ্কারের জন্য নোবেল কমিটি তাঁকে ১৯৬৯ সালেই পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করে।
প্রথমবারের মতো কণা ত্বরক যন্ত্রের ব্যবহার: ১৯৬৮-সালে লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর নামক ২-মাইল দীর্ঘ অতিকায় বন্দুক বা হাইওয়েটি তৈরি করেছিল মার্কিন সরকারের অর্থায়নে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির একটি টিম। যার নেতৃত্বে ছিলেন আরেকজন পদার্থ বিজ্ঞানী উলফগ্যাং প্যানোফস্কি। বিজ্ঞানী টেইলর, ফ্রিডম্যান ও কেন্ডাল সেই বন্দুকের জন্য অত্যন্ত নিখুঁত ডিজিটাল টার্গেট ও ক্যামেরা সিস্টেম (স্পেক্ট্রোমিটার) তৈরি করেছিলেন, যা দিয়ে তারা প্রোটনের মধ্যকার তিনটি কণার ছবি বা উপাত্ত প্রথমবারের মতো ধারণ করতে সক্ষম হন। আর এগুলোর নাম দেওয়া হয় কোয়ার্ক।
কোয়ার্ক নামকরণ: মূলত মারে-গেলম্যান এই কণাগুলোর একটি নাম খুঁজছিলেন। অতঃপর তিনি জেমস জয়সের বিখ্যাত ও অতি-জটিল উপন্যাস ফিনেগানস ওয়েক (Finnegan’s Wake) পড়ার সময় একটি অদ্ভুত লাইন দেখতে পান—”Three quarks for Muster Mark!” উপন্যাসের ওই লাইনে কোয়ার্ক বলতে মূলত গাঙচিলের ডাক বা মদের পাত্রকে বোঝানো হয়েছিল। গেলম্যান দেখলেন প্রকৃতির নিয়মও অদ্ভুত— প্রতিটি প্রোটন ও নিউট্রন তৈরি হতেও ঠিক ৩টি করে কণা লাগে! এই জাদুকরি তিন সংখ্যার মিলের কারণেই তিনি কণাগুলোর অফিশিয়াল নাম দেন কোয়ার্ক।
কোয়ার্কের চার্জে অদ্ভুত নিয়ম: মহাবিশ্বের অন্য সব কণার (যেমন ইলেকট্রন বা প্রোটন) চার্জ বা বৈদ্যুতিক আধান (Charge) সবসময় পূর্ণসংখ্যায় হয় (যেমন -১ বা +১)। কিন্তু কোয়ার্ক হলো মহাবিশ্বের একমাত্র কণা যাদের চার্জ বা আধান হয় অদ্ভুত ভগ্নাংশে! আপ কোয়ার্ক (Up Quark) : এর চার্জ হলো + (ধনাত্মক)। ডাউন কোয়ার্ক (Down Quark) : এর চার্জ হলো – (ঋণাত্মক)।

প্রকৃতির এই গাণিতিক ভগ্নাংশের যোগফলটি লক্ষ্য করুন। দুটি আপ কোয়ার্ক আর একটি ডাউন কোয়ার্ক একসাথে যোগ দিলে তাদের মোট চার্জ হয়ে যায় + (যোগ) যা একটি প্রোটনের চার্জ। আর একটি আপআর দুটি ডাউন কোয়ার্ক একসাথে মিললে চার্জ হয়ে যায় – (বিয়োগ), যা একটি চার্জহীন নিউট্রনের জন্ম দেয়। প্রকৃতি তার সবচেয়ে’ ক্ষুদ্রতম কণাগুলোকে গণিতের কতো নিখুঁত ভগ্নাংশের ছকে বেঁধে রেখেছে, মারে গেল-ম্যানের কোয়ার্ক তারই প্রমাণ।
কণা ত্বরক যন্ত্র এবং সত্যিকারের প্রাথমিক কণা শনাক্তের উপায়: আজকাল পরমাণু, প্রোটন, নিউট্রন কোনোকিছুর অভ্যন্তরীণ অবস্থা আমাদের আর অদেখা নয়। তবে এসব যদি বাস্তবে প্রাথমিক কণা হয়ে থাকে, তবে এদের শনাক্ত করা প্রয়োজন। আলোর সাহায্যে আমরা সবকিছু দেখি। এই দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য পরমাণুর চেয়ে অনেক বড়। সুতরাং কোয়ার্ক তো দূরের কথা পরমাণু থেকেই দৃশ্যমান আলোকরশ্মি প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে পড়বে না। ফলে এসব খালিচোখে দেখার উপায় নাই। তাইলে কীকরে দেখবো? এ প্রসঙ্গে স্টিফেন হকিং “A Brief History of time” গ্রন্থের “মৌলকণা ও প্রাকৃতিক বল” অধ্যায়ে বলেন, “আমরা প্রাথমিক কণাদের খালিচোখে দেখার আশা করতে পারি না। কোয়ান্টাম মেকানিক্স আমাদের বলে যে, সমস্ত কণা আসলে একেকটি তরঙ্গ এবং একটি কণার শক্তি যত বেশি হবে, তার সাথে সম্পর্কিত তরঙ্গের দৈর্ঘ্য ততবেশি ক্ষুদ্র হবে। সুতরাং আমাদের এই প্রশ্নের যে সর্বোত্তম উত্তর আমরা দিতে পারি, তা পুরোপুরি নির্ভর করে আমাদের হাতে ঠিক কত উচ্চ শক্তির কণা রয়েছে, তার ওপর। কারণ এই শক্তির পরিমাণটিই নির্ধারণ করে দেয় যে, আমরা কতো ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্যের স্তরে গিয়ে প্রকৃতিকে দেখতে পাবো। কণার এই শক্তিগুলোকে সাধারণত ইলেকট্রন ভোল্ট (Electron volts-eV) নামক এককে পরিমাপ করা হয়। (থমসনের ইলেকট্রন নিয়ে করা পরীক্ষাগুলোতে আমরা দেখেছি যে, তিনি ইলেকট্রনগুলোকে তীব্র বেগে ছুঁড়তে একটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র ব্যবহার করেছিলেন। একটি ইলেকট্রন এক ভোল্টের একটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র থেকে ঠিক যতটুকু শক্তি লাভ করে, তাই ইলেকট্রন ভোল্ট।“
শক্তির ব্যবহার— ক্ষুদ্রতম এককের অনুসন্ধান: উনবিংশ শতাব্দীতে, যখন লোকেরা কণার শক্তির উৎস হিসেবে কেবল পোড়ানোর মতো রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে উৎপন্ন কয়েকটি ইলেকট্রন ভোল্টের অত্যন্ত নিম্ন শক্তি ব্যবহার করতে জানতো, তখন তারা ভাবতো যে, পরমাণুই পদার্থের ক্ষুদ্রতম একক। যত ক্ষুদ্রতম এককের সন্ধানে যাবেন, তত শক্তির কণা নিক্ষেপ করতে হবে। রাদারফোর্ড সোনার পাতের ওপর আলফা কণা নিক্ষেপ করে বিচ্ছুরণ পরীক্ষার দ্বারা নিউক্লিয়াসের সন্ধান পেয়েছিলেন। আলফা কণার উৎস হিসাবে তিনি রেডিয়ামজাত পদার্থ ব্যবহার করেন। তাঁর এই পরীক্ষায় কণাদের শক্তি ছিল মাত্র পাঁচ মেগা-ইলেকট্রন ভোল্ট (5-MeV), মানে পঞ্চাশ লক্ষ ইলেকট্রন ভোল্ট। কিন্তু সম্প্রতি, আমরা তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্র (Electromagnetic field) ব্যবহার করে কণাকে প্রথমে মিলিয়ন এবং পরবর্তীতে হাজার মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তি কীভাবে দিতে হয়, তা শিখেছি। তাই আমরা এখন বুঝি, যেসব কণাকে আজ থেকে ৭০-বছর আগেও মৌলিক ভাবা হতো, সেগুলো আসলে আরও ক্ষুদ্র কণা দিয়ে তৈরি। আমরা যদি আরও উচ্চ শক্তির দিকে আগাই, তবে কি এই কণাগুলোও পরবর্তীতে আরও ক্ষুদ্রতর কোনও কণা দিয়ে তৈরি বলে প্রমাণিত হতে পারে? এটি নিশ্চিতভাবেই সম্ভব, তবে আমাদের কাছে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট তাত্ত্বিক যুক্তি রয়েছে, যার ফলে বিশ্বাস জাগে যে, আমরা হয়তো প্রকৃতির সেই চূড়ান্ত আদি উপাদানগুলোর (Ultimate Building blocks) জ্ঞান অর্জনের কাছাকাছি রয়েছি। এ রকম আশা আসলে করাই যায়, কিন্তু বাস্তবতা হয়তো ভিন্ন। কেননা প্রত্যেক যুগের বিজ্ঞান গবেষকগণই তো মনে করেন যে, তাদের আবিষ্কারগুলো হয়তো বাস্তব দুনিয়ার চূড়ান্ত পর্যায় বা এর কাছাকাছি। কিন্তু তাদের গবেষণালব্ধ উদ্ভাবনগুলোই পরবর্তী যুগের বিজ্ঞান গবেষণায় হয় পরিশীলিত, না হয় ভুল ধরা পড়ে! বিজ্ঞানের তত্ত্বগুলো আসলে কোনও শেষ কথা নয়। আর এটাই বিজ্ঞানের মৌলিক শক্তি, পচে যাওয়ার ভয় থাকে না (A rolling stone gathers no moss)।
কণা শনাক্তকারী যন্ত্রের প্রকৃতি: আমরা যত ক্ষুদ্র জিনিস দেখতে চাইবো, আমাদের ডিটেক্টরের শক্তি ততবেশি বাড়াতে হবে। ডিটেক্টর বলতে ইলেকট্রন ভোল্ট বৃদ্ধির কণা ত্বরক মেশিনকে (লিনিয়ার এক্সালেরেটর বা এলএইচসি) বুঝানো হয়েছে। একটি কোয়ান্টাম কণা দিয়ে অন্য একটি কোয়ান্টাম কণাকে বিদীর্ণ করলে যদি ভিন্ন একটি কণা নির্গত হয় সেটাই আসলে অন্য ধরণের একটি কোয়ান্টাম কণা। যেমন : আমরা ইতোপূর্বে ইলেকট্রন, কোয়ার্ক, হিগস বোসন কণা শনাক্ত করণের জন্য এই পদ্ধতি দেখেছি। জে জে থমসন ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন ১৮৯৭-সালে। সে সময় কণা ত্বরক যন্ত্র আবিষ্কার হয়নি। তাই তিনি ক্যাথোড-রে টিউব ব্যবহার করেন। আর রাদারফোর্ড ১৯১১-সালে নিউক্লিয়াস আবিষ্কারের জন্য যথাক্রমে একটি সোনার পাত, আলফা কণার উৎস, জিঙ্ক সালফাইড পর্দা ও অণুবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। তবে এই দুটো প্রক্রিয়া মুলত স্ট্যান্ডার্ড মডেলের অন্যান্য উপ-পারমাণবিক কণাদের শনাক্ত করার মতো ততটা কঠিন ছিল না। তাই তাঁরা ছোট ছোট সেটআপ ব্যবহার করে ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াস আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। কিন্তু তারপরের কণাগুলো (কোয়ার্ক, হিগস) শনাক্ত করতে বিজ্ঞানীদের সরকারি সহায়তা নিতে হয়েছিল। কারণ যন্ত্রগুলো অনেক বিশালাকার। যার নির্মাণ খরচ বহন করা কোনও একটি বিজ্ঞান গবেষণাগারের পক্ষে সম্ভব নয়। এভাবে বর্তমানে মহাকর্ষীয় কণা গ্রাভিটন শনাক্ত করণের কাজ চলছে।
অতিপারমাণবিক মৌলকণারা ‘কেন কোয়ান্টাম কণা’? আমরা দৃশ্যমান জগতে যেসব বড় বস্তু দেখি (যেমন, একটি ক্রিকেট বল বা একটি গাড়ি), তাদের আচরণ নিউটনের চিরায়ত বলবিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু ইলেকট্রন বা কোয়ার্কের মতো অতিপারমাণবিক কণাগুলোর ক্ষেত্রে এই সাধারণ নিয়মগুলো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। এদের ‘কোয়ান্টাম কণা’ বলার মূল কারণ দুটি: প্রথমত, শক্তির সুনির্দিষ্ট প্যাকেট (Quantization)। এই কণাগুলো যখন শক্তি আদান-প্রদান করে, তখন তা যে কোনও পরিমাণে করতে পারে না। তারা ম্যাক্স প্লাংকের নিয়ম অনুযায়ী একটি সুনির্দিষ্ট সর্বনিম্ন একক বা প্যাকেটের (যাকে কোয়ান্টাম বা Quanta বলা হয়) পূর্ণ গুণিতক হিসেবে শক্তি গ্রহণ বা বর্জন করে। দ্বিতীয়ত, দ্বৈত সত্তা বা তরঙ্গ-কণা রূপ (Wave-Particle Duality)। দৃশ্যমান জগতের একটি বল কেবল বলই, তা কখনও তরঙ্গ হতে পারে না। কিন্তু অতিপারমাণবিক মৌলকণাগুলো একই সাথে ‘কণা’ এবং ছড়িয়ে থাকা ‘তরঙ্গ’ হিসেবে আচরণ করে। এই অদ্ভুত কোয়ান্টাম আচরণের কারণেই এদের সাধারণ কণা না বলে কোয়ান্টাম কণা বলা হয়।
কোয়ান্টাম কণার ‘অবস্থান’ বলতে কী বুঝায়? আমাদের চেনা জগতে একটি ইটের অবস্থান যেমন সুনির্দিষ্ট (ধরা যাক : একটি কলম টেবিলের ওপর নির্দিষ্ট একটি বিন্দুতে আছে), কোয়ান্টাম কণার অবস্থান কিন্তু মোটেও তেমন নয়। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি অনুযায়ী, একটি কোয়ান্টাম কণা পরিমাপ বা পর্যবেক্ষণ করার আগমুহূর্ত পর্যন্ত কোনও একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে স্থির থাকে না। বরং সেটি তার নিজস্ব ‘ওয়েভ ফাংশন’ বা তরঙ্গ হিসেবে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের সব জায়গায় একই সাথে ছড়িয়ে থাকে। একে আপনি কণার অবস্থানের একটি ‘সম্ভাবনার মেঘ’ (Probability Cloud) বলতে পারেন। আর শ্র্যোডিঙারের তরঙ্গ সমীকরণ অনুযায়ী, একটি কণা ঠিক কোথায় আছে, তা আমরা নিখুঁতভাবে কখনও বলতে পারি না। আমরা কেবল বলতে পারি কণাটিকে অমুক জায়গায় খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা কত শতাংশ। যতক্ষণ না কোনও ডিটেক্টর বা পরিমাপক যন্ত্র দিয়ে তাকে দেখা হচ্ছে, ততক্ষণ তার কোনও নির্দিষ্ট একক অবস্থান থাকে না। যেই মুহূর্তে আমরা তাকে পর্যবেক্ষণ করি, অমনই তার ছড়ানো তরঙ্গটি এক বিন্দুতে ভেঙে পড়ে (Wave Function Collapse) এবং কণাটি একটি সুনির্দিষ্ট অবস্থান ধারণ করে।
আইনস্টাইনের পর ১৯২৪ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে কোয়ান্টাম মেকানিক্স একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করতে শুরু করে। এগুলো আগেই আলোচনা করেছি। এখন আসছি কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের পরবর্তী তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায়।
প্রথমত কোয়ান্টাম কণাদের ভর: মহাবিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি হলো ‘হিগস মেকানিজম’ (Higgs Mechanism)। এর মাধ্যমেই আদি মহাবিশ্বের ভরহীন কণাগুলো ভর লাভ করেছিল এবং ইলেক্ট্রোউইক প্রতিসাম্য ভেঙে আজকের চেনা রূপ ধারণ করেছিল। বিজ্ঞানী পিটার হিগস এবং তাঁর সহকর্মীরা ১৯৬৪ সালে প্রস্তাব করেন যে, বিগ ব্যাং-এর অব্যবহিত পর সমগ্র মহাবিশ্বে একটি অদৃশ্য শক্তির ক্ষেত্র বা ‘হিগস ফিল্ড’ ছড়িয়ে পড়ে। এই ক্ষেত্রের কাজ হলো কণাগুলোর চলাচলে বাধা দেওয়া। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায়, এই জড়তার বাধাই হলো বস্তুর ভর (Mass)।
যে কণা হিগস ফিল্ডের সাথে যত বেশি মিথস্ক্রিয়া (Interaction) করে, হিগস ক্ষেত্রের বাধার কারণে তার ভর তত বেশি হয়। যেমন— টপ কোয়ার্কের সাথে হিগস ফিল্ডের মিথস্ক্রিয়া প্রবল হওয়ায় এটি অত্যন্ত ভারী, আবার ইলেকট্রনের সাথে মিথস্ক্রিয়া দুর্বল হওয়ায় এর ভর খুবই কম। অন্যদিকে, ফোটন বা আলোর কণা এই হিগস ফিল্ডের সাথে বিন্দুমাত্র মিথস্ক্রিয়া করে না; কোনও বাধা পায় না বলেই ফোটন সম্পূর্ণ ভরহীন এবং মহাবিশ্বের সর্বোচ্চ গতিতে ছুটে চলতে পারে।
এই হিগস ফিল্ডের শক্তির ঘনীভূত রূপই হলো ‘হিগস বোসন’ কণা, যাকে সাধারণ মহলে ‘ঈশ্বর কণা’ (God Particle) বলেও ডাকা হয়। ২০১২ সালের ৪ঠা জুলাই সুইজারল্যান্ডের সার্ন (CERN) গবেষণাগার থেকে এই কণা আবিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে বিজ্ঞানী পিটার হিগস এবং ফ্রাঁসোয়া এনগ্লের্ট পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। মোটকথা, হিগস মেকানিজম হলো মহাবিশ্বের সেই কসমিক আঠা, যা আদিম ভরহীন ও বিশৃঙ্খল কণাগুলোকে ভর দিয়ে আজকের এই স্থিতিশীল মহাবিশ্ব সৃষ্টিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।
দ্বিতীয়ত আধান (Charge): কণাগুলোর বৈদ্যুতিক আধান (Electric Charge) এদের একটি সহজাত বৈশিষ্ট্য (Intrinsic Property); অর্থাৎ এই বৈশিষ্ট্য সাথে নিয়েই কণার সৃষ্টি। যেকোনও দৃশ্যমান বস্তুর যেমন দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা থাকে, তদ্রূপ অতিপারমাণবিক কণার একটি মৌলিক পরিচয় হলো চার্জ। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান অনুসারে, একটি কণা তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্র বা ফোটনের (আলোর কণা) সাথে কতটা তীব্রভাবে মিথস্ক্রিয়া করবে তার পরিমাপই হলো চার্জ। যে কণার চার্জ যতবেশি, সে ফোটনের ধাক্কা ততবেশি অনুভব করবে। উদাহরণস্বরূপ, ইলেকট্রনের চার্জ (-1) হওয়ায় সে ফোটনের সাথে জোরালোভাবে যুক্ত হয়। কিন্তু নিউট্রিনোর চার্জ শূন্য (0) হওয়ায় সে ফোটনের সঙ্গে কোনও মিথস্ক্রিয়াতেই জড়ায় না। বরং ফোটন নিউট্রিনোকে স্পর্শ না করেই সরাসরি পার হয়ে চলে যায়। আলো বা ফোটন কেবল সেই সব কণার সাথেই মিথস্ক্রিয়া করতে পারে যাদের বৈদ্যুতিক চার্জ আছে— যেমন: কোয়ার্ক, অ্যান্টি-কোয়ার্ক, ইলেকট্রন, পজিট্রন এবং ডব্লিউ বোসন (W±)। অন্যদিকে নিউট্রিনো ও জেড বোসন (Z) সম্পূর্ণ চার্জহীন বা নিরপেক্ষ কণা হওয়ায় এরা ফোটনের তৈরি করা তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্রের (Electromagnetic Field) সাথে মিথস্ক্রিয়ায় জড়ায় না। চিরায়ত বলবিজ্ঞানে (Classical Mechanics) চার্জকে কেবল আকর্ষণ বা বিকর্ষণের একটি উৎস হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও কোয়ান্টাম তড়িৎগতিবিদ্যা (QED) অনুসারে : চার্জ হলো একটি ‘সংযুক্তি ধ্রুবক’ (Coupling Constant)। একটি কণার চার্জ যত বেশি হবে, সেটি ফোটনের (তড়িৎচৌম্বকীয় বলের বাহক কণা) সাথে তত তীব্রভাবে বল বা শক্তি বিনিময় করবে। যখন দুটি চার্জিত কণা একেঅপরকে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ করে, তখন তারা মূলত নিজেদের মধ্যে ভার্চুয়াল ফোটন কণা আদান-প্রদান করে। এ ক্ষেত্রে যার চার্জ যতবেশি, তার এই কোয়ান্টাম মিথস্ক্রিয়ার (Quantum Interaction) তীব্রতাও ততবেশি হয়।
তৃতীয়ত, কণাগুলোর পাক খাওয়া (Spin): কোয়ান্টাম মেকানিক্সে স্পিন হলো অতিপারমাণবিক কণাগুলোর (ইলেকট্রন, কোয়ার্ক, ফোটন ইত্যাদি) একটি সহজাত কৌণিক ভরবেগ (Intrinsic Angular Momentum)। স্পিন হলো কণাগুলোর এমন এক মৌলিক ভৌত বৈশিষ্ট্য, যা কোনও বাহ্যিক ঘূর্ণন ছাড়াই তাদের ভিতরে সবসময় বিদ্যমান থাকে; ঠিক যেমন কণার একটি নির্দিষ্ট ভর (Mass) বা আধান (Charge) থাকে।
বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তাঁর বিখ্যাত ‘A Brief History of Time’ গ্রন্থে পারমাণবিক কণাদের স্পিন বৈশিষ্ট্য সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, স্পিনকে সহজে বুঝতে অক্ষের ওপর ঘূর্ণয়মান একটি লাটিমের মতো কল্পনা করা হলে কোয়ান্টাম কণাদের ক্ষেত্রে তা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে; কারণ কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুযায়ী, এদের বাস্তব লাটিমের মতো সুসংজ্ঞায়িত কোনও অক্ষ বা পেরেক থাকে না। প্রকৃতপক্ষে, স্পিন হলো এক ধরণের জ্যামিতিক প্রতিসাম্য (Symmetry)— যা নির্দেশ করে একটি কণাকে কত ডিগ্রি ঘোরালে (Rotate), তা দেখতে ঠিক আগের মতো হবে এবং এর কোয়ান্টাম দশায় কী পরিবর্তন আসবে। নিচে তাঁর দেওয়া সহজ উদাহরণগুলো দিয়ে স্পিনের এই বৈশিষ্ট্যটি বোঝানো হলো:
স্পিন-০ (Spin-0) যুক্ত একটি কণা হলো একটি নিখুঁত বিন্দুর (Dot) মতো, একে যেকোনও দিক থেকেই একই রকম দেখায় (চিত্র-১ দ্রষ্টব্য)। অন্যদিকে, স্পিন-১ (Spin-1) যুক্ত একটি কণা হলো একটি একমুখী তীরের মতো; একে ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে দেখতে ভিন্ন ভিন্ন রকম লাগে (চিত্র-২ দ্রষ্টব্য)। একে যদি একটি পূর্ণ চক্কর (৩৬০ ডিগ্রি) ঘোরানো হয়, তখনই কেবল কণাটিকে আগের মতো দেখাবে। আবার, স্পিন-২ (Spin-2) যুক্ত কণা হলো একটি দ্বিমুখী তীরের মতো (চিত্র-৩ দ্রষ্টব্য); একে মাত্র অর্ধেক চক্কর বা ১৮০ ডিগ্রি ঘোরালেই এটি দেখতে আবার আগের মতোই হয়ে যায়।
উপরিউক্ত স্পিনের হিসাব সহজ মনে হলেও সবচেয়ে আশ্চর্যজনক সত্যটি হলো, মহাবিশ্বে এমনকিছু কণা রয়েছে (ফার্মিয়ন, লেপ্টন) যেগুলো কেবল একটিমাত্র পূর্ণ চক্কর (৩৬০ ডিগ্রি) ঘোরালেই আগের রূপ ফিরে পায় না! সেগুলোকে হুবহু আগের রূপে দেখতে হলে পূর্ণ দুই চক্কর (৭২০ ডিগ্রি) ঘোরাতে হয়। এই ধরনের কণাগুলোকে বলা হয় স্পিন- ১/২ (Spin-1/2) যুক্ত কণা। সুতরাং কোয়ান্টাম স্পিনকে আমাদের চেনা জগতের লাটিমের সাথে মেলানো যাবে না। এটি মূলত কণাগুলোর এমন এক অন্তর্নিহিত কোয়ান্টাম ধর্ম, যা স্থান বা ত্রিমাত্রিক জগতের জ্যামিতিক ঘূর্ণনের সাথে কণাটি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তাই নির্ধারণ করে।

কোয়ান্টাম জগতের এই ৭২০ ডিগ্রির রহস্য সাধারণ চোখে বোঝার জন্য গণিতে একটি বিখ্যাত উদাহরণ ব্যবহার করা হয়, যাকে বলা হয় “ডিরাক বেল্ট ট্রিক” (Dirac’s Belt Trick) : আপনার প্যান্টের বেল্টটি এক হাত দিয়ে সোজা ধরে রাখুন। এবার বেল্টটিকে নিজের অক্ষ বরাবর ৩৬০ ডিগ্রি (একবার) ঘোরান। দেখবেন বেল্টটিতে একটি প্যাঁচ লেগে গেছে, যা তার আসল রূপ নয়। এবার বেল্টটিকে একই দিকে আরও ৩৬০ ডিগ্রি (অর্থাৎ মোট ৭২০ ডিগ্রি) ঘোরান। এখন আপনি বেল্টটিকে না মুচড়েই খুব সহজে হাত ঘুরিয়ে একদম সোজা (আগের অবস্থায়) নিয়ে আসতে পারবেন। কোয়ান্টাম জগতের ১/২ স্পিনের কণারাও মহাবিশ্বের স্থানকালের সাথে এই বেল্টের মতোই জ্যামিতিকভাবে যুক্ত থাকে। এটি আরও সহজে বুঝতে এই লিংকটি ইউটিউবে সার্চ দিন https://www.youtube.com/watch?v=EgsUDby0X1M পুরাপুরিভাবে স্পষ্ট হবে। কোয়ান্টাম জগতের ইলেকট্রন বা কোয়ার্কগুলো পথ চলার সময় স্থানকালের সাথে ভিডিয়োতে উল্লেখিত হাত ও কাপের অথবা বেল্টের মতোই এক অদ্ভুত জ্যামিতিক মোচড়ে জড়িয়ে থাকে।
৭২০ ডিগ্রির রহস্যের সন্ধান: ১৯৭৫ সালে বিজ্ঞানীরা নিউট্রন কণা ব্যবহার করে একটি ঐতিহাসিক পরীক্ষা চালান, যা এই ৭২০ ডিগ্রির ধারণাকে বাস্তব প্রমাণ দেয়। তাঁরা একটি নিউট্রন বিমকে (beam) দু’ভাগে ভাগ করেন। একটি ভাগের নিউট্রনগুলোকে একটি চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে পাঠানো হয়, যা তাদের স্পিনকে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দেয়। অন্যভাগটিকে স্বাভাবিকভাবে যেতে দেওয়া হয়। এরপর যখন দুটি ভাগকে আবার একসাথে মেলানো হয় (Interference), তখন দেখা যায় তারা একেঅপরকে বাতিল করে দিচ্ছে (Destructive Interference)। কারণ ৩৬০ ডিগ্রি ঘোরার ফলে প্রথম ভাগের নিউট্রনগুলোর ওয়েভ ফাংশন ঋণাত্মক বা উল্টো হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যখন চৌম্বক ক্ষেত্র বাড়িয়ে নিউট্রনগুলোর স্পিনকে ৭২০ ডিগ্রি ঘোরানো হয়, তখন দেখা যায় তারা আবার অবিকল আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে এবং তরঙ্গ দুটি নিখুঁতভাবে মিলে গেছে।
স্পিন আসলে কী? স্পিন হলো কোয়ান্টাম কণাদের বাস্তব অবয়ব (Physical shape) বা তারা নিজেদের অক্ষের চারপাশে লাটিমের মতো ঘুরছে— এই ধারণা একেবারেই ঠিক নয়। স্পিন হলো একটি কোয়ান্টাম কণার সহজাত বা অভ্যন্তরীণ কৌণিক ভরবেগ (Intrinsic Angular Momentum)। এটি কণার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য, ঠিক যেমন একটি কণার ‘ভর’ (Mass) বা ‘বৈদ্যুতিক চার্জ’ (Electric Charge) থাকে। একটি ইলেকট্রনের যেমন নির্দিষ্ট ভর ও চার্জ আছে (যার জন্য তাকে কোনও যান্ত্রিক কাজ করতে হয় না), তেমনি তার একটি নির্দিষ্ট স্পিনও আছে। ১৯২০-এর দশকে যখন বিজ্ঞানীরা (যেমন : উলফগ্যাং পাউলি, জর্জ উহলেনবেক ও স্যামুয়েল গুডস্মিট) প্রথমবার লক্ষ্য করলেন যে চৌম্বক ক্ষেত্রে ইলেকট্রনগুলো এমন আচরণ করছে, যেন তাদের নিজস্ব একটি কৌণিক ভরবেগ বা চৌম্বক ভ্রামক (Magnetic moment) আছে, তখন বোঝার সুবিধার্থে তারা এর নাম দিয়েছিলেন ‘স্পিন’। চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের লাটিমের ঘূর্ণনের সাথে এর গাণিতিক আচরণের মিল থাকার কারণে এই রূপক নামটি স্থায়ী হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি করে। কোয়ান্টাম কণাদের এই স্পিনই নির্ধারণ করে দেয় মহাবিশ্বের কোনো পদার্থ কীভাবে গঠিত হবে, আর এর পেছনে কাজ করে পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম সেরা নিয়ম— পাউলির বর্জন নীতি (Pauli Exclusion Principle)।
পাউলির নীতি: ১৯২৫ সালে বিজ্ঞানী উলফগ্যাং পাউলি (Wolfgang Pauli) এই নীতিটি প্রকাশ করেন। এটি মূলত পরমাণুর ভিতরে ইলেকট্রনগুলো কীভাবে সাজানো থাকবে, তা নিয়ন্ত্রণ করে। সমস্ত কোয়ান্টাম কণাকে এদের স্পিনের ওপর ভিত্তি করে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়। যেসব কণার স্পিন ভগ্নাংশ বা হাফ-ইন্টিজার (যেমন : ১/২, ৩/২) ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন ও কোয়ার্ক— এগুলো হলো ফার্মিয়ন কণা। আর যেসব কণার স্পিন পূর্ণসংখ্যা বা ফুল-ইনটিজার (যেমন : ০/১/২), সেগুলো হলো বোসন (ফোটন, গ্লুঅন ও হিগস বোসন)। পাউলির বর্জন নীতিটি কেবল ফার্মিয়ন কণাদের (যেমন : ইলেকট্রন, কোয়ার্ক) জন্য প্রযোজ্য। সহজ ভাষায় এই নীতিটি হলো : একটি পরমাণুর ভিতরে দুটি ইলেকট্রন কখনও এক বা অভিন্ন কোয়ান্টাম অবস্থায় থাকতে পারে না। একটি ইলেকট্রনের সম্পূর্ণ অবস্থান নির্ধারণ করা হয় ৪টি কোয়ান্টাম সংখ্যা (Quantum Numbers) দিয়ে, যার শেষটি হলো তার স্পিন কোয়ান্টাম সংখ্যা (𝑚𝑠)। ইলেকট্রনের স্পিন মূলত দুই রকম হতে পারে—”স্পিন আপ” (+১/২) অথবা “স্পিন ডাউন” (−১/২)। পাউলির নীতি অনুযায়ী, পরমাণুর একটি নির্দিষ্ট অর্বিটালে যদি দুটি ইলেকট্রন থাকে, তবে তাদের সব বৈশিষ্ট্য এক হলেও স্পিন অবশ্যই বিপরীত হতে হবে (একটি আপ হলে অন্যটি ডাউন হতে হবে)। ফলে ওই একই জায়গায় তৃতীয় কোনও ইলেকট্রন প্রবেশ করতে পারে না।
পাউলির বর্জন নীতিই মহাবিশ্বকে টিকিয়ে রেখেছে: যদি পাউলির বর্জন নীতি এবং স্পিনের এই বাধ্যবাধকতা না থাকতো, তবে মহাবিশ্বের রূপ সম্পূর্ণ বদলে যেতো। পদার্থের অস্তিত্ব থাকতো না। একটি পরমাণুর সমস্ত ইলেকট্রন আকর্ষিত হয়ে একদম ভিতরের সর্বনিম্ন শক্তির স্তরে (Ground state) গিয়ে জটলা পাকাতো। কোনও বহুতল কক্ষপথ বা পর্যায় সারণী (Periodic Table) তৈরি হতো না। সমস্ত পরমাণু সংকুচিত হয়ে যেতো এবং মহাবিশ্বের সব কঠিন পদার্থ বা অবয়ব ভেঙে পড়তো। রসায়নের জন্মই হতো না। ইলেকট্রনগুলো আলাদা আলাদা স্তরে স্তরে বা শেলে (Shell) থাকে বলেই পরমাণুর একদম বাইরের স্তরের ইলেকট্রনগুলো অন্য পরমাণুর সাথে যুক্ত হয়ে রাসায়নিক বন্ধন তৈরি করতে পারে। এর ফলেই পানি, বায়ু, ডিএনএ ও আমাদের চারপাশের বস্তু জগৎ তৈরি হয়েছে।
বোসনদের ক্ষেত্রে কী ঘটে?: অন্যদিকে, ফোটনের মতো বোসন কণাগুলো পাউলির বর্জন নীতি মেনে চলে না; এর মানে হলো, অসীম সংখ্যক ফোটন কণা একই সাথে, একই জায়গায়, হুবহু একই কোয়ান্টাম অবস্থায় থাকতে পারে। এই বিশেষ গুণের কারণেই কিন্তু আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সুসংহত লেজার রশ্মি তৈরি করতে পারি, যেখানে কোটি কোটি ফোটন কণা এক হয়ে একই দিকে প্রবাহিত হয়। সংক্ষেপে, স্পিনের ভিন্নতার কারণে ফার্মিয়ন কণারা একেঅপরকে জায়গা ছেড়ে দূরে থাকে, যা আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান বস্তু জগৎ তৈরি করে। আর বোসনরা (ফোটন) একসাথে মিলেমিশে শক্তির প্রবাহ তৈরি করে।
স্ট্যান্ডার্ড মডেলের নিচের স্তবকে বলেছিলাম যে, আদি মহাবিশ্বে উল্লেখিত কণারা আলাদা ছিল না। বরং তারা একসাথে মিশে একটি একক বল হিসেবে কাজ করতো, যাকে ‘ইলেক্ট্রোউইক বল’ বলা হয়। অতঃপর হিগস কণাদের আবির্ভাব হলে কোয়ান্টাম কণারা ভরবাহী (ফার্মিয়ন) ও বলবাহী (বোসন) দুই জাতে বিভক্ত হয়ে পড়ে— যেগুলো নিয়ে উপরে স্ট্যান্ডার্ড মডেল সাজানো হয়েছে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, কোয়ান্টাম মেকানিক্সে কণাগুলো বাস্তবিক অর্থে আমাদের চেনা জগতের মতো কোনও নিরেট বা শক্ত বস্তু নয়। পর্যবেক্ষণের পূর্ব পর্যন্ত এরা স্রেফ সম্ভাব্যতার তরঙ্গ অবস্থায় থাকে। তরঙ্গের সুনির্দিষ্ট কোনও স্থান বা সময় নির্ধারণ করা যায় না বলে এরা সম্ভাব্য সবস্থানেই যুগপৎ বিরাজ করতে পারে। এই অর্থে, কোয়ান্টাম কণাদের কোনও একক বা সুনির্দিষ্ট অতীত থাকে না। অথচ এই কোয়ান্টাম কণাদের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে আমাদের এই ভৌতজগত। যার মূলে কেবল সম্ভাবনার তরঙ্গ ও কণা লুকিয়ে থাকলেও ভৌত জগতের প্রতিটি দৃশ্যমান সদস্যেরই স্থানকালে একটি সুনির্দিষ্ট ত্রিমাত্রিক উপস্থিতি এবং একমুখী সময়ের ধারা রয়েছে। বৃহৎ মহাবিশ্বের যাত্রায় এই সময়টা এক পরম অতীত থেকে শুরু হয়ে ক্রমাগত সামনের দিকে বয়ে চলে। আর আমাদের এই চেনা জগতের সুনিশ্চিত অতীতের আসল ভিত্তি হলো কোয়ান্টাম স্তরের সেই তরঙ্গায়িত কণাসমূহ। যাদের ভর, আধান ও স্পিনের মতো মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে আমরা এতক্ষণ আলোচনা করলাম। প্রাথমিক কণাদের সহজাত ধর্মই আমাদের চারপাশের দৃশ্যমান বস্তুজগতকে অস্তিত্বে এনেছে, যার একটি সুনির্দিষ্ট ও নিশ্চিত অতীত রয়েছে। আর সেই অতীতেরই আদি বিন্দু হলো মহাবিস্ফোরণের (Big Bang), সেই পরমক্ষণ, যে মহিমান্বিত মুহূর্ত থেকে শুরু হয়েছে আমাদের এই মহাবিশ্ব এবং সময়ের অনন্ত ইতিহাস।


































































