আমরা আজ এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন পৃথিবীর উন্নত ও সভ্য দেশগুলোতে বসবাস করার সুযোগ অনেকের হয়েছে। উন্নত অবকাঠামো, আইনের শাসন, মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক শৃঙ্খলার মধ্যে থেকেও একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে, আমরা কি সত্যিই সভ্য হতে পেরেছি? নাকি কেবল ভৌগোলিক অবস্থান পরিবর্তন করেছি, কিন্তু মানসিকতা ও আচরণে রয়ে গেছি সেই পুরোনো সংকীর্ণতার গন্ডিতেই?
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক মানুষ বিদেশে এসে উন্নত সমাজের ইতিবাচক মূল্যবোধ গ্রহণ করার পরিবর্তে নিজ দেশের বিভাজনমূলক ও নোংরা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই বহন করে নিয়ে আসে। ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, দলীয় অন্ধত্ব, সামাজিক হিংসা এবং অকারণে সমালোচনার মাধ্যমে তারা শুধু নিজেদেরই ছোট করে না, বরং নিজেদের দেশের ভাবমূর্তিকেও ক্ষুণ্ণ করে। একটি জাতির পরিচয় কেবল তার পতাকা বা ভূখন্ডে নয়; সেই জাতির নাগরিকদের আচরণ, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার মধ্যেই তার প্রকৃত পরিচয় নিহিত থাকে।
সমালোচনা অবশ্যই গণতান্ত্রিক সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু সমালোচনা হতে হবে তথ্যভিত্তিক, যুক্তিনির্ভর এবং দায়িত্বশীল। আজ আমরা এমন এক প্রবণতা লক্ষ্য করি, যেখানে যোগ্যতার চেয়ে উচ্চকণ্ঠ হওয়াকেই অনেকেই অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বা বিষয়বস্তুর গভীর উপলব্ধি ছাড়াই অন্যের কাজ, অর্জন কিংবা মেধার সমালোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে গঠনমূলক আলোচনার পরিবর্তে সৃষ্টি হয় বিদ্বেষ, বিভ্রান্তি এবং সামাজিক অস্থিরতা।
একটি সমাজ তখনই সুস্থভাবে এগিয়ে যায়, যখন প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব ও দক্ষতার জায়গাটিকে সম্মান করে। কৃষকরা খাদ্য উৎপাদন করবেন, শিক্ষকরা জ্ঞান বিতরণ করবেন, চিকিৎসকরা মানুষের সেবা করবেন, প্রকৌশলীরা উন্নয়ন নির্মাণ করবেন এবং রাজনীতিবিদরা জনগণের কল্যাণে কাজ করবেন। প্রত্যেকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্মানজনক। কিন্তু যখন অজ্ঞতা জ্ঞানের আসনে বসতে চায়, তখন সমাজে ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং প্রকৃত যোগ্যতার মূল্যায়ন ব্যাহত হয়। আমাদের সমাজে একটি পুরোনো প্রবাদ আছেঃ-
‘‘আসলে রে কলির কাল,
হরিণে চাটে বাঘের গাল।‘‘
এই প্রবাদটি মূলত সামাজিক উল্টোপথের একটি প্রতীকী চিত্র। যখন যোগ্যতা ও অযোগ্যতার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়, তখন সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে কেউ প্রশ্ন করতে পারবে না; বরং প্রশ্ন ও সমালোচনার পূর্বশর্ত হলো জ্ঞান, শালীনতা এবং দায়িত্ববোধ। সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় উচ্চশিক্ষার সনদে নয়, বরং আচরণে। একজন মানুষ কত বড় ডিগ্রিধারী, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো তিনি কতটা মানবিক, কতটা সহনশীল এবং কতটা দায়িত্বশীল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে আমরা খুব সহজেই অন্যকে আঘাত করতে পারি, কিন্তু নিজেদের দিকে তাকিয়ে আত্মসমালোচনা করতে অনেক সময়ই অনিচ্ছুক থাকি। অথচ আত্মসমালোচনাই উন্নতির প্রথম ধাপ।
আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া। প্রয়োজন ভিন্নমতকে সম্মান করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা। প্রয়োজন জ্ঞানকে মর্যাদা দেওয়া এবং অজ্ঞতার অহংকার থেকে বেরিয়ে আসা। মনে রাখতে হবে, আমরা যেখানে থাকি না কেন, আমাদের প্রতিটি আচরণ আমাদের পরিবার, সমাজ এবং দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। অতএব, সভ্য দেশে বসবাস করলেই কেউ সভ্য হয়ে যায় না; সভ্য হতে হলে প্রয়োজন সভ্য চিন্তা, সভ্য ভাষা এবং সভ্য আচরণ। ব্যক্তি হিসেবে আমরা যদি নিজেদের দায়িত্ব, সীমাবদ্ধতা এবং কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হই, তবে কেবল নিজেরাই নয়, আমাদের সমাজ ও জাতিও সম্মানিত হবে। অন্যথায় আমরা আধুনিক পোশাকে আবৃত হলেও মানসিকভাবে অসভ্যতার অন্ধকারেই রয়ে যাব।





















































