সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরকারি কৌঁসুলি জানিয়েছেন, ইসরায়েলগামী ফ্লাইদুবাই (Flydubai) বিমানের কো-পাইলট বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উদ্দেশ্যে পাইলটকে একটি ‘ক্র্যাশ এক্স’ (জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহৃত কুঠার) দিয়ে আক্রমণ করেছিলেন। দুবাই থেকে তেলআবিবগামী ওই বিমানে ১৭০ জনেরও বেশি যাত্রী ছিলেন। যাত্রার আড়াই ঘণ্টা পর বিমানটি হঠাৎ প্রায় ১৭,০০০ ফুট (৫,২০০ মিটার) নিচে নেমে যায়; তবে এর আগেই যাত্রীরা আক্রমণকারীকে কাবু করে বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিতে সক্ষম হন। ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার বলেন , আহত অবস্থায় বিমানের মেঝেতে পড়ে থাকার সময় তিনি বুঝতে পারেন যে বিমানটি নিচে নেমে যাচ্ছে এবং তাঁকে কিছু একটা করতেই হবে। তিনি আরো বলেন, “আমি চিন্তা করলাম, ভেতর থেকে দরজাটি খোলার জন্য শেষবারের মতো জোর চেষ্টা চালাতে হবে”—যার ফলে যাত্রীরা ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন। এরপর দুজন অতিরিক্ত পাইলট বিমানটিকে নিরাপদে সৌদি আরবে অবতরণ করাতে সক্ষম হন।সাধারণত জরুরি পরিস্থিতির জন্য ককপিটে একটি ‘ক্র্যাশ এক্স’ বা জরুরি কুঠার রাখা থাকে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের অ্যাটর্নি জেনারেল রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ পরিস্থিতি ও এর পেছনের উদ্দেশ্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে।ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষ্যমতে, হামলাকারী কো-পাইলট ছিলেন ওমানের নাগরিক।রয়টার্স, সিএনএন এবং নিউইয়র্ক টাইমসসহ একাধিক গণমাধ্যম তাঁর নাম হামাম আল-হাম্মামি হিসেবে উল্লেখ করেছে।মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওমান এয়ারে কর্মরত থাকাকালীন উগ্রবাদী চিন্তাধারার কারণে আল-হাম্মামিকে ফ্লাইট প্রশিক্ষণ কার্যক্রম থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং তাঁকে ওমানের জাতীয় বিমান সংস্থায় অন্য একটি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এবিসি নিউজের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়,তিনি ইংল্যান্ডের বাকিংহামশায়ার নিউইউনিভার্সিটিতে দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে তিন বছর মেয়াদী একটি কোর্স সম্পন্ন করেন ২০২৩ সালে। এভিয়েশন ম্যানেজমেন্ট বা বিমান চলাচল ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। অন্য আরো একটি সূত্র সংবাদমাধ্যমটিকে জানিয়েছে যে, ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আল-হাম্মামি কোনো পাইলট প্রশিক্ষণ নেননি।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরাইরী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেন, বিমানে হামলাকারীকে কাবু করার পর সে ক্রু-দের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলছিল, “আমাকে মেরে ফেলো, আমাকে মেরে ফেলো!” ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন: “সুতরাং, এটা স্পষ্ট যে সে আত্মঘাতী হতে চেয়েছিল…খুব সম্ভবত সে বিমানটি বিধ্বস্ত করার পরিকল্পনা করেছিল।” তিনি আরও বলেন , হামলাকারী “ইসলামপন্থী উগ্রবাদী মতাদর্শে দীক্ষিত” হয়েছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনাটি কোনো সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কি না, বা এর নেপথ্যে আরো কি কারণ থাকতে পারে সবকিছু মাথায় নিয়েই নিয়ে দেশটি তদন্ত শুরু করেছে। হামলায় ছুরিকাহত মাচ্ছারকে প্রথমে নিকটস্থ একটি হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরে আকাশপথে আবুধাবিতে স্থানান্তর করা হয়; বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, ভারতীয় বংশোদ্ভূত পাইলট “সুস্থ আছেন এবং দ্রুত সেরে উঠছেন”।পাইলট মাচ্ছার বলেন, “আমি নিশ্চিত যে আমি সুস্থ হয়ে উঠব এবং আবারও পুরোপুরি ফিট ও ভালো অবস্থায় ফিরে আসব।” দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর বিমানটি হঠাৎ দ্রুতগতিতে নিচের দিকে নামতে শুরু করে। বিমানটি প্রথমে ‘সাধারণ জরুরি অবস্থা’ বা ‘স্কোয়াক ৭৭০০’ (squawk 7700) সংকেত দেয়; এরপর এটি ‘স্কোয়াক ৭৫০০’ (squawk 7500) সংকেতে পরিবর্তিত হয়, যা ‘বেআইনি হস্তক্ষেপ’ বা বিমান ছিনতাইয়ের ইঙ্গিত দেয়।
বিবিসি-র সাথে এক সাক্ষাৎকারে একজন যাত্রী সেই মুহূর্তটির বর্ণনা দিয়েছেন, তার মতে যখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে কোনো একটা সমস্যা হয়েছে। যাত্রী আলমোগ ইতালি বলেন: “হঠাৎ করেই বিমানটি রোলারকোস্টারের মতো প্রচণ্ড ‘জি-ফোর্স’ (G-force) বা অভিকর্ষজ বলের প্রভাবে নিচের দিকে নামতে শুরু করে। এটি ২০ বা ৩০ সেকেন্ড ধরে দ্রুতগতিতে নিচে নামছিল, তারপর সাময়িক স্থিতিশীল হয় এবং এরপর আবারও নিচে নামতে শুরু করে।” তিনি জানান, এরপরই যাত্রীরা ককপিটের দিকে ছুটতে শুরু করেন। ফ্লাইদুবাইয়ের এই পাইলট হাসপাতাল থেকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলছেন বলে জানা গেছে। ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, বিমানের ভেতরে থাকা ইসরায়েলি নারী তালি মানেস প্রথম বিপদের বিষয়টি বুঝতে পারেন; তিনি ককপিট থেকে হট্টগোলের শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন। আহত হওয়া সত্ত্বেও ক্যাপ্টেন মাচ্ছার যখন ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন, তখন তালির স্বামী জভিকা এবং আরও তিনজন যাত্রী—ইয়ানিভ হায়ুন, ডা. শোতা মুসায়েভ ও আসাফ রাজুয়ান—ককপিটের ভেতরে প্রবেশ করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে হায়ুন জানান যে, হামলাকারী “বিমানটিকে অকেজো করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এর নিয়ন্ত্রণযন্ত্র বা ইনস্ট্রুমেন্টগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করছিল”। এরপর হায়ুন বর্ণনা করেন কীভাবে তিনি হামলাকারীকে পেছন থেকে জাপটে ধরে (চোকহোল্ড করে) ককপিটের বাইরে টেনে আনেন এবং পরবর্তীতে অন্য যাত্রীরা তাকে চেপে ধরে কাবু করতে সহায়তা করেন। তিনি আরও জানান, তিনি বিমানের নিয়ন্ত্রণদণ্ড বা ‘কন্ট্রোলস’ ধরেছিলেন। তিনি বলেন, “বিমানটি ধীরে ধীরে সোজা বা সমান্তরাল অবস্থানে আসতে শুরু করে এবং তখন [অন্য একজন] পাইলট আমাকে জানান যে তিনি সেখান থেকে নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন।” বুধবার সন্ধ্যায় সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, ছুরিকাঘাতের শিকার পাইলট, যাত্রী এবং দ্বিতীয় ক্রু সদস্য মিলে “৯/১১-এর মতো বিপর্যয় ঠেকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন”।


































































