চীন এখনও তাইওয়ানকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি যদিও, অথচ তার আগেই তারা সেই অঞ্চলের সমুদ্রসীমায় নিজেদের খবরদারি ও নিজস্ব নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া শুরু করেছে।
দুটি পরাশক্তির মধ্যকার দ্বন্দ্বে সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত সেটি নয় -যেদিন তাদের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ বেঁধে যায়। বরং সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত হলো সেটি -যখন কোনো এক পক্ষ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই এমন আচরণ করতে শুরু করে, যেন তারা অলরেডি যুদ্ধে জিতে গেছে।
এই সপ্তাহে ঠিক তেমনই এক মারাত্মক মুহূর্তের সাক্ষী হওয়া গেছে।
জাপান এবং ফিলিপাইন নিজেদের মধ্যকার জলসীমা বা সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণ করার জন্য আলোচনার টেবিলে বসেছিল। কিন্তু তারা মানচিত্রে যে সীমানাটি টেনেছে, তা কাকতালীয়ভাবে একদম তাইওয়ানের ঠিক পূর্ব দিকে গিয়ে পড়েছে।
চীন এই পদক্ষেপকে সরাসরি তাদের নিজস্ব জলসীমায় বহিরাগত হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য করেছে এবং অনতিবিলম্বে সেই বিতর্কিত সমুদ্রসীমায় নিজেদের ভারী যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে দিয়েছে।
সাধারণ মানুষ বা বাকি বিশ্ব এটিকে হয়তো আর দশটা সাধারণ সামুদ্রিক উত্তেজনা বা বর্ডার ডিসপিউট বলে মনে করেছে। কিন্তু আসলে এমন না।
সমুদ্রের বুকে ঘটা এই ছোট্ট আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ ঘটনাটি অনেক বড় ও ভয়াবহ কিছুর এক প্রাথমিক ইঙ্গিত।
পর্দার পেছনের সেই আসল সমীকরণটা একটু দেখা যাক-
সবার আগে আমাদের দেখতে হবে ঠিক কী ঘটেছিল।
গত ২৮শে মে জাপানের প্রধানমন্ত্রী এবং ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্টের মধ্যে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে তাঁরা যৌথভাবে একটি বড় সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই দুই দেশ সমুদ্রের বুকে নিজেদের মধ্যকার ‘এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন’ বা অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমা যৌথভাবে নির্ধারণ করবে।
আন্তর্জাতিক নিয়মে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মধ্যে নিজেদের জলসীমা নিয়ে চুক্তি করা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। প্রতিটি দেশেরই তার নিজস্ব উপকূল বা তীর থেকে সমুদ্রের ভেতরের দিকে একটি নির্দিষ্ট এলাকা পর্যন্ত অধিকার থাকে।
সেই এলাকার মাছ, সমুদ্রের তলদেশের খনিজ তেল কিংবা প্রাকৃতিক গ্যাস -সবকিছু ব্যবহারের একক আইনি অধিকার থাকে সেই সংশ্লিষ্ট দেশের।
কিন্তু এবার এই দুই দেশ মানচিত্রে ভাগাভাগির জন্য যে জায়গাটিকে বেছে নিয়েছে, তা ছিল অত্যন্ত অদ্ভুত ও স্পর্শকাতর।
আর তা হলো -তাইওয়ানের ঠিক পূর্ব দিকের সমুদ্র অঞ্চল।
আর ঠিক এই জায়গাতেই লুকিয়ে আছে পুরো কূটনীতির আসল মোড়।
কারণ বেইজিং তত্ত্বগত ও রাজনৈতিকভাবে তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ড বলে মনে করে। চীনের কমিউনিস্ট সরকারের মতে, তাইওয়ান কোনো আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র নয়, বরং তা মূল চীনেরই একটি অংশ।
আর আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির নিয়ম অনুযায়ী, একটি দেশের স্থলভাগের সীমানা যেখানে গিয়ে শেষ হয়, তার সামুদ্রিক অধিকারও ঠিক সেখান থেকেই সমুদ্রের বুকে বিস্তৃত হয়।
অর্থাৎ, চীনের হিসাব অনুযায়ী -তাইওয়ানের পূর্ব দিকের সেই বিশাল জলসীমাও আক্ষরিক অর্থেই চীনের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সমুদ্র এলাকা।
এবার একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করুন। জাপান আর ফিলিপাইনের মধ্যকার এই চুক্তি কিন্তু সম্পূর্ণ তাদের নিজেদের দ্বিপাক্ষিক বিষয়। দুই দেশ স্রেফ তাদের নিজেদের মধ্যকার বর্ডার নিয়ে কথা বলছিল। চীন কিন্তু এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির কোনো পক্ষ বা অংশীদারই ছিল না।
কিন্তু তা সত্ত্বেও চীন বুনো ষাঁড়ের মতো এই আলোচনার মাঝখানে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আর তারা কেবল মুখের কথায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েই ক্ষান্ত হয়নি।
বিগত বহু বছর ধরে এই ধরণের পরিস্থিতিতে চীনের চেনা মডেল ছিল -একটি কড়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া, ঘটনার তীব্র নিন্দা করা কিংবা বড়জোর কূটনৈতিক স্তরে প্রতিবাদ জানানো।
কিন্তু এবার বেইজিং সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আক্রমণাত্মক চাল চেলেছে। তারা কোনো প্রকার প্রোটোকলের তোয়াক্কা না করে সরাসরি তাদের কোস্ট গার্ড বা উপকূল রক্ষী বাহিনীর ভারী জাহাজগুলোকে তাইওয়ানের পূর্ব জলসীমায় পাঠিয়ে দিয়েছে;
এবং সেখানে নিয়মিত টহল দেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের আইন ও সার্বভৌমত্ব প্রয়োগ করা শুরু করে দিয়েছে।
অর্থাৎ, চীন এবার স্রেফ মুখের ফাঁকা বুলি বা বাগযুদ্ধ ছেড়ে সরাসরি মাঠের বুকে অ্যাকশনে নেমে গেছে।
বিষয়টি এভাবেও ভাবতে পারেন -দুই প্রতিবেশী মিলে তাদের নিজেদের বাড়ির পেছনের বাগানের সীমানা নিয়ে কথা বলছে। এটি সম্পূর্ণ তাদের নিজেদের ভেতরের ব্যাপার।
কিন্তু হঠাৎ করে এক তৃতীয় ব্যক্তি লাঠি হাতে সেখানে এসে হাজির হলো এবং বুক ফুলিয়ে বলল –
“তোমরা এখানে কোনো সীমানা টানতে পারবে না, এই পুরো বাগান আসলে আমার!” সে স্রেফ মুখে এই দাবি করেই শান্ত হলো না, বরং সেই বাগানের গেটে লাঠি হাতে নিজের বিশ্বস্ত দারোয়ান বা পাহারাদারও বসিয়ে দিল।
অথচ বাস্তব সত্য হলো -আইনি বা বাহ্যিক উপায়ে সেই বাগান কিন্তু এখনও তার দখলে আসেনি।
আর ঠিক এই জায়গাতেই সবচেয়ে মারাত্মক ভয়ের কারণ।
চীন এখন আর বিশ্বমঞ্চে স্রেফ এই দাবি করছে না যে ,”ভবিষ্যতে একদিন তাইওয়ান আমাদের হবে।” বরং তারা এখন থেকেই এমন আচরণ করা শুরু করেছে যেন -“তাইওয়ান অলরেডি আমাদেরই হয়ে গেছে।”
যে দ্বীপটি তারা এখনও সামরিক উপায়ে নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিতেই পারেনি, সেই দ্বীপের সমুদ্রসীমায় অন্য দুটি দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নস্যাৎ করতে জাহাজ পাঠিয়ে দেওয়ার মতো চরম আত্মবিশ্বাস আজ বেইজিং দেখাচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো -মানচিত্রের এই বিপজ্জনক কাটাকাটি ঠিক এই নির্দিষ্ট জায়গাতেই কেন করা হলো?
ভৌগোলিক মানচিত্রের দিকে একবার চোখ রাখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
জাপানের একদম শেষ প্রান্তের দ্বীপপুঞ্জগুলো তাইওয়ানের ঠিক উত্তর দিকে, মাত্র ১১০ কিলোমিটারের এক চিলতে দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত। অন্যদিকে, ফিলিপাইনের অবস্থান ঠিক তাইওয়ানের দক্ষিণ সীমান্ত ঘেঁষে।
অর্থাৎ, ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে তাইওয়ান দ্বীপটি উত্তরে জাপান এবং দক্ষিণে ফিলিপাইনের ঠিক মাঝখানে এক স্যান্ডউইচের মতো চিপে রয়েছে।
এখন এই দুই প্রতিবেশী দেশ যদি নিজেদের মধ্যে একটি অভিন্ন সামুদ্রিক রেখা টেনে দেয়, তবে তাইওয়ানের পূর্ব দিকের পুরো সমুদ্র অঞ্চলটি এই দুই দেশের একচ্ছত্র প্রভাবে চলে যাবে। আর চীন সেখানে সম্পূর্ণ একঘরে বা আউটসাইডার হয়ে পড়বে।
সহজ কথায় -একটি দ্বীপকে তার দুই প্রতিবেশী উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে এক শক্ত সাঁড়াশির মতো চিপে ধরছে, যা পরোক্ষভাবে চীনকে সেই প্যাসিফিক মহাসাগরের জলসীমা থেকে ধাপে ধাপে চিরতরে মুছে দেওয়ার এক সূক্ষ্ম চক্রান্ত।
কিন্তু এই দাবার ছকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টুইস্টটি এখনও বাকি।
বিগত বহু বছর ধরে বিশ্বের সমস্ত সামরিক বিশ্লেষক ও গোয়েন্দাদের চোখ ছিল মূলত তাইওয়ানের পশ্চিম দিকের জলসীমার ওপর। কারণ সেই প্রণালীটি অত্যন্ত সরু এবং তা মূল চীনের ভূখণ্ডের একবারে কাছাকাছি।
আমরা সবাই এতদিন ভেবে এসেছিলাম, যদি কোনোদিন যুদ্ধ বাঁধে তবে তার মূল স্ফুলিঙ্গ এই পশ্চিম দিক থেকেই ছড়াবে।
অথচ বাস্তব সত্য হলো –
তাইওয়ানের আসল লাইফলাইন বা জীবনদায়ী রুটটি লুকিয়ে আছে তার পূর্ব দিকে, যা সরাসরি প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে মুখ করে থাকা দ্বীপের পেছনের অংশ।
কারণ এই পূর্ব দিকটি হলো মূলত তাইওয়ানের ‘পেছনের দরজা’। যদি কোনোদিন চীনের সাথে ফুলস্কেল যুদ্ধ বাঁধে, তবে তাইওয়ানকে বাঁচাতে মার্কিন নৌবাহিনীর যে বিশাল বহর ধেয়ে আসবে -তাদের ঢোকার একমাত্র রাস্তা হলো এই পূর্ব দিকটিই।
ওদিকে গুয়াম (Guam) দ্বীপে থাকা আমেরিকার বিশাল সামরিক ঘাঁটি থেকে তাইওয়ানে সাহায্য পাঠানোর একমাত্র হাইওয়ে হলো এটি। এমনকি মার্কিন সাবমেরিনগুলো চীনের চোখ ফাঁকি দিয়ে সমুদ্রের যে গভীর তলদেশে লুকিয়ে থাকে, সেই গভীর জলসীমাও মূলত এটিই।
অর্থাৎ, যে পক্ষ তাইওয়ানের এই পূর্ব দিকের সমুদ্রের চাবি নিজের পকেটে পুরতে পারবে -সে একাধারে পুরো তাইওয়ান দ্বীপ এবং আমেরিকার কাছ থেকে আসা সমস্ত সামরিক ও রসদ সাহায্যকে এক নিমেষে লক বা অবরুদ্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করবে।
সমুদ্রের বুকে যখন এই মারাত্মক দাবার চালগুলো একের পর এক চলছে, ওদিকে বৈশ্বিক রাজনীতির একদম শীর্ষ স্তরের দৃশ্যপটও কিন্তু দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
গত মাসগুলোতে শি জিনপিং বেইজিংয়ের মাটিতে ট্রাম্পের সাথে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুখোমুখি বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন।
আর চীনের অফিশিয়াল প্রেস রিলিজ অনুযায়ী -শি জিনপিং ট্রাম্পকে একবারে স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তাইওয়ান ইস্যুটি হলো দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও রেড লাইন, এবং এখানে যদি কোনো ভুল পদক্ষেপ বা ভুল হ্যান্ডেলিং করা হয়-
তবে দুই পরাশক্তি সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে একে অপরের মুখোমুখি এসে দাঁড়াবে, এমনকি পরিস্থিতি এক ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের দিকে ধাবিত হতে পারে।
পরাশক্তিদের আলোচনার টেবিলে যখন সরাসরি ‘সামরিক সংঘাত’ বা যুদ্ধের শব্দ এসে যায়, তখন বুঝতে হবে এই ঝামেলা আর কোনো সাধারণ কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
কিন্তু এই সমীকরণকে সবচেয়ে বেশি জটিল ও বিপজ্জনক করে তুলেছে ট্রাম্পের পাল্টা জবাব।
ট্রাম্প তাইওয়ানকে যেকোনো পরিস্থিতিতে রক্ষা করার বিষয়ে কোনো প্রকার অকাট্য বা স্পষ্ট গ্যারান্টি দিতে সাফ অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি খোলাখুলিভাবে এমন কোনো আশ্বাস দেননি যে -“চীন হামলা করলে আমেরিকা নিজের জান বাজি রেখে তাইওয়ানকে বাঁচাবে।”
বরং উল্টো সুর চড়িয়ে ট্রাম্প বলেছেন, তাইওয়ানের কোনো অবস্থাতেই আমেরিকার কাছ থেকে কোনো অন্ধ সমর্থনের আশা করা উচিত নয়।
তিনি আকার-ইঙ্গিতে এটিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, নিজের দেশ থেকে হাজার মাইল দূরের এই পুঁচকে দ্বীপের জন্য আমেরিকা কোনো বড়সড় যুদ্ধে জড়াতে খুব একটা আগ্রহী নয়।
আমেরিকার এই ধোঁয়াশা বা রহস্যময় কূটনৈতিক অবস্থান কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়ার এই অঞ্চলের উত্তেজনাকে মোটেও কমাচ্ছে না; বরং তা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কারণ চীন যদি একবার নিশ্চিত হয়ে যায় যে -হামলা করলে আমেরিকা সত্যিই সরাসরি যুদ্ধে নামবে না, তবে বেইজিং তাইওয়ানকে গিলে ফেলার জন্য যেকোনো সময় জুয়া খেলতে দ্বিধাবোধ করবে না।
আর এই আগুনের সাথে যুক্ত করুন আরেকটি মারাত্মক বাস্তবতা -পর্দার আড়ালে এক অদৃশ্য ঘড়ির কাঁটা অবিরাম টিকটিক করে উল্টো গণনা করে চলেছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গোপন রিপোর্ট অনুযায়ী—শি জিনপিং তাঁর বাহিনীকে এক সুনির্দিষ্ট ডেডলাইন বা লক্ষ্য বেঁধে দিয়েছেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যেন ২০২৭ সালের মধ্যে তারা তাইওয়ানকে পুরোপুরি সামরিক উপায়ে দখল করার মতো সক্ষমতা অর্জন করে।
অর্থাৎ, চীনের জন্য এটি কোনো বহু দূরবর্তী বা অলীক স্বপ্ন নয়। এর জন্য তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার ও সময়সূচী রেডি রয়েছে।
আর ওদিকে এই আগ্রাসন রুখতে জাপানও বসে নেই; তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নিজেদের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে সামরিকায়নের বা অস্ত্র মজুতের মহোৎসবে মেতে উঠেছে।
যে দেশটি এতদিন তাদের সংবিধানের দোহাই দিয়ে সেনাবাহিনী বা প্রতিরক্ষা বাজেট ছোট করে রাখত -তারা আজ এক অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় গতিতে নিজেদের সামরিক ডানা মেলে ধরছে।
সুতরাং, দৃশ্যপটটি একবার মিলিয়ে দেখুন -একদিকে একটা নির্দিষ্ট সময় মাথায় নিয়ে দিন গুনতে থাকা এক জেদি চীন। অন্যদিকে রাতারাতি যুদ্ধের পোশাকে সেজে ওঠা এক পুনরুত্থিত জাপান। আর এই দুই দানবের ঠিক মাঝখানে পড়ে প্রতিনিয়ত কাঁপতে থাকা এক চরম আতঙ্কিত তাইওয়ান।
আর এই নাটকের সবচেয়ে বিপজ্জনক মোড়টি কিন্তু এখানেই।
একটি রাষ্ট্র যখন স্রেফ টেবিলের কূটনৈতিক কাগজের বাগযুদ্ধ বা তর্কাতর্কি বাদ দিয়ে সরাসরি সমুদ্রের বুকে যুদ্ধের জাহাজ নামিয়ে দেয় -তখন পুরো ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণই রাতারাতি ওলটপালট হয়ে যায়।
এখন আর আন্তর্জাতিক মহলে এই প্রশ্ন করার কোনো যৌক্তিকতা নেই যে-“চীন কি আদৌ কোনোদিন তাইওয়ানকে আক্রমণ করতে চায়?” বরং এখনকার আসল প্রশ্নটি হলো
“চীন ঠিক কোন দিন, কোন ক্ষণে এই আক্রমণটি শুরু করতে যাচ্ছে।”
সুতরাং, আমরা আজ ইতিহাসের এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি –
এটি কিন্তু সমুদ্রের বুকে স্রেফ একটা সাধারণ ম্যাপ বা জলসীমা ভাগাভাগির কোনো মামুলী বিতর্ক নয়। তাইওয়ান আজ আক্ষরিক অর্থেই পুরো পৃথিবীর সবচেয়ে ভঙ্গুর ও মারাত্মক এক টাইম বোমায় পরিণত হয়েছে।
বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মাইক্রোচিপের সিংহভাগই উৎপাদিত হয় এই ছোট্ট দ্বীপের বুকে, আর দুই মহাশক্তির বৈশ্বিক স্বার্থ ও আধিপত্যের চাকা এসে থমকে গেছে ঠিক এই একই বিন্দুতে।
আমরা শুরুতে একটি কথা বলেছিলাম -দুটি পরাশক্তির মধ্যকার দ্বন্দ্বে সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত হলো সেটি, যখন কোনো এক পক্ষ লড়াইয়ে জেতার আগেই নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে অহংকার দেখায়।
চীন এই সপ্তাহে ফিলিপাইন ও জাপানের সীমানার মাঝখানে নিজেদের কোস্ট গার্ডের জাহাজ পাঠিয়ে ঠিক সেই বিপজ্জনক ও দুঃসাহসিক মুহূর্তের ঘরে নিজেদের প্রথম পা-টি বাড়িয়ে দিল।
জুনায়েদ হারুন, কিং সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং ইসলামী চিন্তাধারা ও সভ্যতা বিষয়ে অধ্যয়নরত।
Source:
Junaid Harun




























































